ব্লগ একাত্তর-

ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসাইনের উত্থান

সাদ্দাম হচ্ছে ইরাকের সাবেক অধিনায়ক যাকে সবাই নায়ক বা খলনায়ক বলে। ইরাকে টানা বিশ বছর অধিনায়কের ভূমিকা পালন করেছে। তিনি ছিলেন ইরাকের প্রেসিডিন্ট। সাদ্দাম হুসাইনের শাসন আমলে ইরাকের এক শ্রেণী মানুষ অন্যায়-অত্যাচরে ভিষণ ভাবে শিকার হয়েছিল। সাদ্দাম হুসাইনকে ২০০৩ সালে আমেরিকার এক যৌথ বাহিনীর অভিযানে ডিসম্বর মাসে গ্রেফতার হয়। এবং তার বিরুদ্ধে রায় আসে মৃত্যুদন্ড। পরবর্তী সময়ে তাকে মৃত্যুদন্ডে কার্যকর করে। আজমি আমি এই ব্যাক্তির উত্থান নিয়ে আর্টিকেলটি লিখেছি। তাহলে চলুন শুরু করা যাক।

সাদ্দামের জন্ম হয় ১৯৩৭ সালে। তার জন্মের কয়েক মাস আগে সাদ্দাম হুসাইনের বাবা নিরুদ্দেশ হয়ে যান। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাত তার বড় ভাই তার বাবার মৃত্যুর কয়েক মাস পরেই। এই ঘটনায় সাদ্দামের মা ভিষণ বিষন্নতায় ভূগছিলেন। কারণ দুই ঘটনা তার মায়ের পক্ষে সামলানো ছিল ভিষণ কঠিন।

সাদ্দাম হুসাইনের বয়স যখন তিন বছর তখন তাকে তার চাচার কাছে পাঠিয়ে দেয়। তিনি সেই চাচার কাছেই বড় হয়। আবারও সাদ্দাম হুসাইন ফিরে আসেন তার মায়ের কাছে। কিন্তু সাদ্দাম হুসাইন একটি বড় ধরনের ধাক্কা খান যখন তিনি জানের তার মায়ের আরেকটি বিয়ে হয়েছে। সাদ্দাম হুসাইন আবারও ফিরে আসেন তার চাচার কাছে। তার চাচা ছিল একজন সুন্নি মুলমান। তার চাচার রাজনৈতিক কর্মকান্ড দেখে তিনি ভিষন ভাবে প্রভাবিত হন।

সাদ্দাম হুসাইন ১৯৫৭ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে ল’ স্কুলের পড়া ছেড়ে দিয়ে চাচার বাথ পার্টিতে যোগ দেন।এই পার্টির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে আরব দেশগুলোর একত্রীকরণ। ঐ আমলে ইরাকের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আব্দ আল-কারিম কাশিম। ১৯৫৯ সালে সাদ্দাম হুসাইন এবং বাথ পার্টির কিছু সদস্য মিলে প্রেসিডেন্ট কাশিমকে হত্যার চেষ্টা করে।

সাদ্দামদের পরিকল্পনা ছিল ‘আল-রশিদ’ স্ট্রিটে কাশিমের গাড়িতে উপর হামলা করবে। গাড়ির পেছনের যারা বসা থাকবে তাদেরকে গুলি করবে একজন এবং বাকিরা গুলি করবে গাড়ির সামনের সিট লক্ষ্য করে। কাজটা ভালো মতই এগুচ্ছিল কিন্তু সমস্যা ছিল আসল জায়গায়। সাদ্দাম কোন রকম পরিকল্পনা না করেই অপরিকল্পিত ভাবে গুলি ছুঁড়তে থাকেন।

গুলি করার কিছুক্ষণ পর চারদিক যখন স্তব্ধ হয়ে গেল তখন তারা মনে করেছিল যে, গাড়ির ভেতরের সবাই মারা গিয়েছে। একটা জায়গায় তার ভূল করল তারা নিশ্চিত না হয়েই তারা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। হাতে এবং কাঁধে গুলিবিদ্ধ হলেও প্রেসিডেন্ট এ যাত্রায় বেঁচে যান। তবে প্রাণ হারান তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক। সাদ্দাম নিজেও পায়ে গুলিবিদ্ধ হন।

এই কাজে যারা অপারেশন করেন তাদের মধ্যে কয়েকজন গ্রেফতার হয় এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড আদেশ দেয়া হয়। কিছু কারণে তাদের মৃত্যুদন্ড দণ্ড কার্যকর করা হয়নি। সাদ্দাম তার কিছু সঙ্গী-সাথী নিয়ে কোনোভাবে সিরিয়া পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। সেখান থেকে ১৯৬০ সালে মিশরে চলে যান এবং ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন।

যদিও তাদের অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়, কিন্তু সাদ্দামের ভয়ঙ্কর রণমূর্তি এবং লড়াকু মনোভাব দীর্ঘদিন ইরাকি জনগণ ভুলতে পারেনি। ‘রামাদান বিদ্রোহের’ মাধ্যমে ১৯৬৩ সালে ইরাকি আর্মির সমর্থনে কাশিমের সরকারকে উৎখাত করে।

বাথ পার্টির নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠিত হয় এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয় আব্দুল সালাম আরিফ। সাদ্দাম হুসাইন আবার দেশে ফিরে আসেন এবং দক্ষতার পরিচয় দেন। ১৯৬৩ সালে পার্টির অন্যতম প্রধান নেতা আলী সালিহ আল-সাদি সহ বারো জনকে অস্ত্রের মুখে মাদ্রিদে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেই কাউন্সিলের প্রধান নিযুক্ত হয়েছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আহমেদ হাসান আল-বকর।  বাগদাদ রেডিওতে এই ঘোষণা প্রচারের পর আল-সাদির হাজার হাজার সমর্থক রাস্তায় নেমে আসে। তবে আল-বকরের বাহিনী পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়। পরদিন আল-সাদি ঘোষণা দেন, তিনি সিরিয়ান বাথ পার্টির সমর্থকদের নিয়ে ইরাকে ফিরে আসবেন।

১৯৬৩ সালের নভেম্বরে তিনি বাথ পার্টিকে সরকার থেকে বহিষ্কার করেন। বাথ পার্টির ১২ জন সদস্যকে সরকার থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। বিলুপ্ত করা হয় পার্টির মিলিশিয়া বাহিনী। বোমা ফেলা হয় বাহিনীর সদরদপ্তরে। প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া হয় আল বকরকে। এমন টালমাটাল পরিস্থিতিতে মাদ্রিদ থেকে আর ফেরার সু্যোগ হয়নি আল-সাদির। নির্বাসিতই থেকে যান তিনি।

পার্টির এরকম দুরাবস্থায় অবস্থায় শক্ত হাতে হাল ধরেন হাসান আল-বকর। দলকে পুনরায় সংগঠিত করেন তিনি। দলে তার শক্তি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। আল-বকরের সাথে সাথে সাদ্দামের শক্তিও বৃদ্ধি পেতে থাকে। কারণ ততদিনে সাদ্দাম নিজেকে আল বকরের একজন বিশ্বস্ত সহযোগীতে পরিণত করেছেন। আল বকর নিয়মিত সাদ্দামকে গুরুতপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দিতেন এবং সাদ্দাম সেগুলো দক্ষতার সাথে পালন করতেন।

১৯৬৪ সালে বাথ পার্টি সরকারকে উৎখাত করার একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালায়। অভ্যুথান ব্যর্থ হলে  আল বকর এবং সাদ্দামকে জেলে যেতে হয়। দুই বছরের দণ্ড হয় তাদের। ১৯৬৬ সালে সাদ্দাম জেল থেকে মুক্তি পেলে আল বকর তাকে ইরাকের বাথ পার্টির ডেপুটি সেক্রেটারি নিযুক্ত করেন। এই পদে থাকাকালে সাদ্দাম সংগঠক হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দেন এবং দলকে আরো সুসংগঠিত করেন।

১৯৬৮ সালে বাথ পার্টি আরো একটি অভ্যুত্থান সংঘটিত করে। সাদ্দাম এবং সালাহ ওমর আল-আলী সামনে থেকে এর নেতৃত্ব দেন। যদিও এর প্রধান ছিলেন আহমেদ হাসান আল-বকর। তবে এবার আর ১৯৬৪ সালের মতো ব্যর্থতা নয় বরং ভালোভাবে সফল হয় তারা। আরিফ সরকারের পতন ঘটে। আরিফ লন্ডনে পালিয়ে যান। সেখান থেকে চলে যান তুরস্কে। পুনরায় ক্ষমতায় আসে বাথ পার্টি। নতুন সরকারের প্রেসিডেন্ট হলেন আল-বকর এবং সাদ্দাম হলেন তার ডেপুটি।

১৯৬৮ সালে যখন বাথ পার্টি ক্ষমতায় আসে তখন ইরাক নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত। সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা ছিল প্রবল। জাতিগতভাবে সমগ্র ইরাক ছিল বিভক্ত। সুন্নি-শিয়া, আরব-কুর্দি বিরোধ ছিল চরমে। এরকম পরিস্থিতিতে সাদ্দাম প্রথমেই মনোনিবেশ করলেন দেশের স্থিতি আনয়নে। একইসাথে জোর দিলেন নিরাপত্তার দিকে। পুনরায় যেন আর কোনো অভ্যুথান ঘটতে না পারে সেজন্য সেনাবাহিনী এবং দলের মধ্যে চালানো হলো শুদ্ধি অভিযান।

সাদ্দামের পৃষ্ঠোপোষকতায় নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং সবার জন্য বিনা খরচে আবশ্যিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। জীবনযাত্রার মান উন্ননের দিকে মনোনিবেশ করা হয়। কয়েক বছরের মধ্যে হাজার হাজার ছাত্র শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়। সবার জন্য বিনা খরচে চিকিৎসা সেবা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। কৃষিতে প্রচুর ভর্তুকি দেওয়া হয়।

১৯৭৩ সালের দিকে তেলের দাম বেড়ে গেলে সাদ্দাম ইরাককে তেলভিত্তিক অর্থনীতির দেশ হিসেবে গড়ে তোলেন। দেশের আয় বেড়ে যায় কয়েক গুণ। ফলে অবকাঠামোগত দিকে নজর দেওয়া সহজ হয়। সাদ্দামের পৃষ্ঠপোষকতায় বড় বড় দালান, বড় বড় কল-কারখানা,  নতুন নতুন রাস্তা-ঘাট গড়ে উঠতে থাকে। হাজার হাজার মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসে আরো উন্নত জীবন-যাপনের আশায়। কয়েক বছর আগের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কাটিয়ে ইরাকি জনমনে তখন নতুন ভোরের স্বপ্ন।

১৯৭৬ সালে সাদ্দাম ইরাকি আর্মড ফোর্সের জেনারেল পদে অধিষ্ঠিত হন এবং ধীরে ধীরে নিজেকে সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত করেন। এ সময় প্রেসিডেন্ট আল-বকর বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে পড়েন। সেই সুযোগে সাদ্দাম সরকারের মুখপাত্র হিসেবে দেশে এবং বিদেশে পরিচিতি লাভ করেন। ধীরে ধীরে সাদ্দাম হয়ে ওঠেন দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আল বকর তখন শুধু নামেমাত্র প্রধান। সাদ্দাম এ সময় দলের মধ্যে নিজের সমর্থন আরো বাড়াতে থাকেন এবং নিজের একটি শক্তিশালী সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে তোলেন।

১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট আল-বকর সিরিয়া এবং ইরাককে একত্রিত করার সিদ্ধান্ত নেন। এ লক্ষ্যে তিনি সিরিয়ার সাথে আলোচনা করতে থাকেন। এই একত্রীকরণ সংঘটিত হলে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল-আসাদ হতেন সমগ্র রাষ্ট্রের ডেপুটি এবং আল-বকর হতেন প্রেসিডেন্ট। এমনটা হলে সাদ্দামের ক্ষমতা অনেকটাই খর্ব হয়ে যেত। তাই তিনি নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন।

প্রেসিডেন্ট আল বকরকে ক্ষমতা ছাড়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন এবং নানাবিধ ভয় ভীতি দেখাতে থাকেন। একসময় প্রেসিডেন্ট নতি স্বীকার করেন এবং ১৯৭৯ সালের ১৬ জুলাই প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা দেন। নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন সাদ্দাম হুসাইন আব্দ আল-মাজিদ আল-তিকরিতি। ইরাক তখন তার পদতলে। তিনিই তখন ইরাকের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

সবাই ভালো থাকুন সুস্থ্য থাকুন এই কামনায় আমার পোষ্টটি শেষ করছি। আর নিয়োমিত ভিজিট করুন ব্লগ একাত্তরে

Advertisements
mm

Rony

যা জানি তা জানাতে চাই ☺

Add comment

Your Header Sidebar area is currently empty. Hurry up and add some widgets.