ব্লগ একাত্তর-

গল্প- করুণা

একটা ব্যাগ কাঁধে করে রাস্তায় হাঁটতে তাকলাম। অফিসে যাব। মাথায় অল্প করে তেল দিলাম। আগে অনেক দামি জেল দিতাম। আমি একটা রিক্সা ডাক দিলাম। আর কত হাঁটব। অনেক হেঁটেছি। আমি রিক্সায় একটা পা তুলতেই সুস্মিতা একটা ডাক দিল। ” হিমু এখানে দাঁড়াও। ”
এই কথা বলে আমার কাছে আসল। আমি লজ্জা চোখ নিয়ে সুস্মিতার চোখের দিকে তাকালাম। আমি লজ্জা পাচ্ছি খুব লজ্জা পাচ্ছি। লজ্জার জন্য সুস্মিতার দিকে তাকাতে পারলাম না।
সুস্মিতা একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল ” আমাকে ভুলে গেলে? একটা দিন ফোনও দেও নি। তোমাকে অনেক খুঁজেছি। কোথাও খুঁজে পাই নি। ”
তুমি কোথায় ছিলে? ”
আমি চোখের কোণে পানি এনে বললাম ” কেন আমি তো এই পৃথিবীতে ওই ছিলাম। তুমি ভালো করে ডাক দেও নি তাই আমাকে খুঁজে পাও নি। আচ্ছা একটা কথা বলতো তোমাকে আমি কেন মনে রাখব? তুমি এমন কি আমার জন্য করছ যে আমি তোমাকে মনে রাখব? তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেছ। আমার দিকে তুমি একটিবার তাকাও নি। আমি কিভাবে ছিলাম। আমি ভালো আছি কিনা? কত প্রশ্ন। আমি তোমাকে ছাড়া খুব শূন্যতায় ছিলাম। সেটা তুমি এখন পূরণ করতে পারবে না। আমি এখন খুব ভালো আছি। আমি এখন একা তাকতে পারি। তুমি আমার জীবনে আর আসতে হবে না। আমাকে অবহেলা করতে হবে না। আমাকে তোমার করুণার চোখ দিয়ে আমাকে বাঁচাতে হবে না। ”
সুস্মিতার চোখে পানি। সুস্মিতা চোখ থেকে এক দুই ফোটা পানি ফেলে দিয়ে বলে ” বিশ্বাস করো সেটা আমার ভুল ছিল। আমি তোমাকে মিস করতাম। ”
আমি কান্না করে অন্য দিকে চেয়ে বললাম ” হ্যাঁ। তুমি করতে হয়তো। কিন্তু সেটা করুণা করে। মানুষ কে করুণা করতে তোমার অনেক ভালো লাগে। ”
সুস্মিতা হাত টা আমার মুখের সামনে এনে বলে ” হিমু অনেক হয়েছে। এখন একটু নিরব থাকো। ”
আমি হাত টা সরিয়ে বললাম ” সুস্মিতা আমারও কিন্তু একটা মন আছে। এই মন টা যে পাথরের মতো শক্ত তা না কিন্তু। একদম নরম। তোমার মনের মতো শক্ত না। তোমাকে আমি এখন ভালোবাসি কিনা জানতে চাইবে না। সেটা আমার মনের ব্যাপার। আমি যদি এখনও তোমাকে ভালবাসি। তুমি ভয় পেয় না। আমি তোমার কাছে যাব না। তোমার কাছে আমার কোনো অধিকার নেই। যদিও ছিল সেটা করুণা ছিল। আমি তোমাকে ভালবাসতাম। কিন্তু তুমি আমাকে করুণা করতে। এখানে তোমার কোনো দোষ ছিল না। সব দোষ আমার। তোমার স্থান কোথায় আর আমি কোথায় । ”
সুস্মিতা চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কথা বলছে না। আমি বললাম ” তুমি আমাকে সহ্য করতে পার না আমি জানি। আমি না অনেক চেষ্টা করছি তোমাকে ভালবাসতে যাব না কিন্তু শালার মন টা একটা স্বার্থপর। আমাকে পাগল করে দিয়েছিল। না সুস্মিতাকে ওই ভালবাসতে হবে। আমি বারবার মন টা কে বুঝাতে চেষ্টা করছি বাংলাদেশে অনেক মেয়ে আছে তাদের কে আমি ভালবাসব। কিন্তু না আমি পারি নি। আমি মনের কাছে হেরে গেলাম। আমি তোমাকে ভালবেসে ফেললাম। তোমাকে প্রপোজ করলাম। তুমিও আমাকে গ্রহণ করলে কিন্তু সেটা করুণা ছিল। সুস্মিতা আমার কথা আর শুনতে চায় না চলে গেল।
.
হাতে একটা সিগারেট নিলাম। সিগারেট কে একটা প্রশ্ন করলাম ” ভাই তুই কি সুস্মিতার চেয়ে ক্ষতিকারক? ”
আমি না খুব পাগল। আসলেই পাগল। এসব কথা বলতে বলতে সুস্মিতা আমাকে ফোন দিল। সুস্মিতা ফোন দিয়ে জিজ্ঞাস করল ” আমি কেমন আছি? ”
আমি একটু সময় চুপ তাকলাম। তারপর সুস্মিতা আবার প্রশ্ন করল ” আমি কেমন আছি? ” আমি সুস্মিতার উত্তরে বললাম ” সে অধিকার তোমার নেই। তুমি হাজার চেষ্টা করেও সে অধিকার নিতে পারবে না। ”
সুস্মিতা মন খারাপ করে বলল ” সে অধিকার আমি নিয়ে ওই বলছি। বলো কেমন আছ? ”
আমি বললাম ” আমি ভালো নেই। আমি তোমার জন্য ভালো নেই। তোমাকে এখন খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। তুমি এখন ইচ্ছা করলেও দেখা করতে পারবে না কারণ তোমার এখন স্বামী আছে। তোমার সন্তান আছে। তোমার সংসার আছে। তোমার পৃথিবী টা আমার মতো দূষিত না। তোমার পৃথিবী টা এখন স্বপ্ন দেখে। তুমি ইচ্ছা করলেই স্বপ্ন দেখতে পারবে কিন্তু আমি দেখতে পারব না। ”
সুস্মিতা বলল ” তুমি আমাকে দেখতে চাও তাইলে বাহিরে এসে আকাশের দিকে তাকাও। আমাকে খুঁজার চেষ্টা করো আমাকে খুঁজে পাবে। ”
আমি কষ্টের মাঝে হাসি দিয়ে বললাম ” হাহাহাহা। তোমাকে আমি আগেই খুঁজে পাই নি এখন তো অসম্ভব। ” সুস্মিতা লজ্জা পেয়ে গেল মোবাইল টা রেখে দিল। ”
আমি নিজে কে প্রশ্ন করলাম ” সুস্মিতা কেন আমার সাথে খেলা করে? ”
ভিতর থেকে উত্তর আসল ” কারণ তুই তো মেয়েটা কে ভালবাসিস তাই। মেয়ে টা কে তুই ঘৃণা কর তাইলে তোকে মিথ্যা স্বপ্ন আর দেখাবে না। ”
আমি পারব না সুস্মিতা কে ঘৃণা করতে। সুস্মিতা নিষ্পাপ। সুস্মিতা কে ভালবাসা আমার উচিৎ হয় নি। আমি ভালবাসি তোমাকে সুস্মিতা। সুস্মিতা তুমি যেখানে তাকো ভালো থাকো। সুস্মিতা তোমার কোনো দোষ নেই। সব দোষ আমার। আমি তোমাকে ভালবেসেছিলি।
.
এক কাপ চা খেতে লাগলাম। তাও আবার রঙ চা। রঙ চা খেলে নাকি ঘুম চলে যায়। আমার এখন ঘুমে ধরেছে। আমি বাহিরের দিকে চেয়ে তাকলাম। সুস্মিতা আমার কাছে আসল। আমার পাশে বসে বলে ” আমার না শান্তি নাই। আমি তো হাবিব কে ভালবেসে ছিলাম। ভালবেসে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু সে আমাকে ঠকাল। সে আরেক টা বিয়ে করেছে। আমি এখন একা খুব একা। ”
আমি সুস্মিতার দিকে চেয়ে বললাম ” সুস্মিতা আমি কি হাবিব ভাইয়ের সাথে কথা বলব? ”
সুস্মিতা আশা ছেড়ে বলে ” তার আর দরকার নেই। আমি তার কাছ থেকে চলে এসেছি। ”
আমি সুস্মিতার দিকে চেয়ে বললাম ” সুস্মিতা এখন তুমি কি করবে? ”
সুস্মিতা হাসি দিয়ে বলে ” আমাকে গ্রহণ করবে? ”
আমি সুস্মিতার কাছ থেকে উঠে বললাম ” সেটা আমার জন্য সুযোগ। আমি চাইলেই কিন্তু এখন তোমাকে গ্রহণ করতে পারতাম। কিন্তু আমি তোমার যোগ্য না। আমি যদি তোমার যোগ্য হতাম তাইলে আমাকে ছেড়ে চলে যেতে না। তুমি এতো টা দুর্বল হউ নি। তুমি ইচ্ছা করলেই আরেক টা সংসার করতে পার। ”
সুস্মিতা চোখের পানি ফেলে দিয়ে আমার কথা শুনতে লাগল। আমিও চোখের পানি ফেলে দিয়ে বললাম ” সুস্মিতা তুমি আমাকে ফেলে গিয়ে ছিলে আবার আমার কাছে ফিরে আসার জন্য না। এই লড়াই টা তোমার। তোমাকে এই লড়াইয়ে জিততে হবে। তুমি আমার কাছে কেন হারবে? তুমি হারতে পার না সুস্মিতা। তুমি হারলে আমি নিজে কে ক্ষমা করতে পারব না। ”
সুস্মিতা আমাকে ধমক দিয়ে চুপ করতে বলে। আমি চুপ হয়ে যায়। সুস্মিতা কান্না করে বলে ” আমি তখন তোমার ভালবাসা বুঝতে পারি নি। আমি এখন তোমাকে খুব ভালবাসি। ” আমি হাসি দিয়ে বললাম ” এখন আমি তোমাকে ভালবাসি না। তোমার জন্য শুধু করুণা আমার। ”
এই কথা বলে হাঁটতে লাগলাম। সুস্মিতা কে আমি করুণা করব। সে যোগ্যতা আমার নেই। আমি মিথ্যা বলছি। আমি সুস্মিতাকে আগের থেকে এখনও অনেক ভালবাসি। আমি কোনো দিন সুস্মিতা ঘৃণা করতে পারি না।
করবও না। সুস্মিতা আমার প্রেমে পড়ে নি। আমি সুস্মিতার প্রেমে পড়েছিলাম। তাইলে আমি কিভাবে সুস্মিতা কে ঘৃণা করব। আমি হাবিব ভাইয়ের কাছে গেলাম। হাবিব ভাই কে অনেক বুঝালাম কিন্তু তিনি বুঝতে রাজি না। আমি কি করব? সুস্মিতার জন্য আমি কি করতে পারি। আমার মাথায় কিছু আসছে না । আমি সুস্মিতার সাথে অন্যায় করতাছি।
আমি রেললাইনের দিকে যাচ্ছি। মেয়ে টা কে? একটা শিশু কান্না করছে কেন? আমি দৌড় দিলাম। মেয়ে টা তো সুস্মিতা। ধাক্কা দিয়ে সুস্মিতা কে সরিয়ে ফেলে দিলাম। সুস্মিতা আমার দিকে চেয়ে বলছে ” আমি তো ভুল করেছি। সেটা তো অনেকবার বলেছি। তুমি তো বিশ্বাস করো না। তাইলে আমাকে বাঁচালে কেন? ”
আমি গালে একটা থাপ্পড় দিলাম। তারপর বললাম ” তোমাকে আমি বাঁচাই নি। শিশু টির মাকে বাঁচিয়েছি। তোমার মতো আমি এতো স্বার্থপর না। তুমি যদি মারা যেতে তাইলে শিশু টিকে কে দেখত। শিশু টি কাকে মা বলে ডাকত? হয়তো তোমার আর আমার মধ্যে এই বুঝ টাই প্রার্থক। তুমি নিজের স্বার্থের জন্য সব করতে পারো। নিজের সন্তান কে ছেড়ে চলেও যেতে পার। তুমি আমাকে ৭ বছর যে কষ্ট দিয়েছ সেটা ফিরিয়ে দিতে পারবে? পারবে না। কারণ এখন আমার আবেগ নেই। হারিয়ে গেছে সে আবেগ। এখন বিবেক দিয়ে কাজ করতে হয়। তোমাকে আমি নিজের করে নিব কিন্তু আমাকে করুণা করতে পারবে না। নিজের মন থেকে ভালবাসতে হবে।” সুস্মিতা মাথা নাড়িয়ে রাজি হলো। শিশু টা কে নিয়ে আমরা দু’জন হাঁটতে লাগলাম।
.
লেখা : তামিম আহমেদ হিমু ( মুরুব্বি )

Advertisements

Add comment

Your Header Sidebar area is currently empty. Hurry up and add some widgets.