ব্লগ একাত্তর-

মাদকসম্রাট থেকে কলম্বিয়ার রবিনহুড

১৯৪৯ সালের ১ ডিসেম্বর মেডেলিনের পাশেই এক ছোট্ট শহর এনভিগালদোতে জন্মগ্রহণ করেন এসকোবার। কৃষক বাবা এবং স্কুলশিক্ষিকা মায়ের ৭ ছেলেমেয়ের মধ্যে ৩য় ছিলেন এসকোবার। তা-ই শৈশবকাল অভাবেই কেটেছে তার। কৈশোরে পদার্পণ করতেই মেডেলিনে আবাস গাড়ে এসকোবাররা, আর সেখান থেকেই শুরু হয় পাবলোর অপরাধ জগতে পদার্পণ। কিংবদন্তী রয়েছে যে, শিশু পাবলো ঘোষণা করেছিলেন যে, তিনি মিলিয়নিয়ার হবেন। এবং তিনি হতাশও করেননি। গাড়ি চুরি, নকল লটারির টিকিট বিক্রিসহ ছোটোখাটো অপরাধ করতে করতে পরবর্তীতে স্থানীয় গ্যাংস্টারদের দেহরক্ষী হিসেবেও কাজ শুরু করেন তিনি। আর এভাবেই অপরাধ জগতে পরিচিত মুখ হয়ে যান। মেডেলিনের এক স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তাকে অপহরণ করে এক লক্ষ মার্কিন ডলার বাগিয়ে নেওয়ার পর মেডেলিনের অপরাধীদের কাছে নায়ক বনে যান পাবলো। আর ঠিক সেই সময়েই কলম্বিয়াতে কোকেনের ব্যবসার শুরু হয়েছে মাত্র। আর যুক্তরাষ্ট্রে কোকেনের চাহিদা শুনে পাবলো তার পরবর্তী পরিকল্পনা ঠিক করলেন, কোকেন পাচারই হতে পারে তার মিলিয়নিয়ার হওয়ার প্রধান রাস্তা।

অল্প বয়সেই অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়েন এসকোবার; Image Source: Read-The-Trieb

এসকোবার ছোটভাবেই শুরু করলেন। ১৯৭৫ সালের কথা, বলিভিয়া থেকে কোকা পেস্ট আমদানি করে তার ভাইয়ের সাথে কোকেন বানানো শুরু করলেন। তারপর পুরনো প্লেনের চাকায় সেগুলো ভরে ছোট্ট একটা প্লেনে করে পানামায় পাচার করে আসতেন। প্রতিবার ৫ লক্ষ ডলারের কোকেন পাচার করলেও, বিমানবন্দরের অফিসারদেরকে প্রায় ৩ লক্ষ ডলার করে ঘুষ দিতে হতো। সুতরাং, বেশি লাভের জন্য আরো বড় শিপমেন্ট পাচারের প্রয়োজন হয়ে পড়লো।

‘দ্য গডফাদার’

কোকেন ব্যবসা শুরু করার কয়েক মাসের মধ্যেই মেডেলিনের কোকেন ব্যবসার প্রধান ফ্যাবিও রেস্ত্রেপোকে সরিয়ে দিয়ে নিজেকে আসীন করলেন এসকোবার। তারপর তিন ওচোয়া ভাইকে নিয়ে গঠন করলেন মেডেলিন কার্টেল। পুরো মেডেলিন শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তাকে ‘এল পাদ্রিনো’ অর্থাৎ ‘দ্য গডফাদার’ নামে ডাকা শুরু হলো।

১৯৭৮ সালের মধ্যেই মেডেলিন কার্টেল প্রতি মাসে ৩৫ কিলোগ্রামেরও বেশি কোকেন পাচার করতে শুরু করলো। ১৯৮০ এর শুরুর দিকে হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্রে কোকেনের দাম কমে গেলো, ফলে এই আসক্তি-সৃষ্টিকারী সাদা পাউডারের জন্য লোকজনের চাহিদা আরো বেড়ে গেল। আর এই চাহিদা পূরণ করার দায়িত্ব নিলেন এসকোবার! এ কাজ করার জন্য এসকোবার গঠন করলেন বিশাল এক নেটওয়ার্ক, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, পুলিশ অফিসার আর স্থানীয় কর্মকর্তাদেরকে টাকা দিয়ে কিনে নিলেন এসকোবার। ফলে বলিভিয়া আর পেরু থেকে প্রচুর পরিমাণে কোকা পাতা আমদানি হতে শুরু করলো, সেই কোকা পাতা দিয়ে কলম্বিয়া আর ভেনিজুয়েলায় তৈরি হতে লাগলো কোকেন, আর তারপর সেটা ক্যারিবিয়ান অথবা মধ্য আমেরিকা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে লাগলো। কলম্বিয়াসহ সবজায়গাতেই সরকারি কর্মকর্তাদেরকে ঘুষ দিয়ে মুখ বন্ধ রাখা হলো, টাকা না নিতে চাইলে সীসার বুলেট তো রয়েছেই! মেডেলিন কার্টেল গঠিত হওয়ার এক দশকের মধ্যেই স্থানীয় ব্যবসা রূপ নিলো আন্তর্জাতিক এন্টারপ্রাইজে, যাদের দৈনিক আয় ছিল ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার!

নিজের মেয়ের সাথে এসকোবার; Image Source: All That’s Interesting

এসকোবারের ক্ষমতা দিনের পর দিন বেড়েই চললো, আর এসকোবার অপরাধ জগতে ঢুকেই বুঝতে পেরেছিলেন, ক্ষমতা অর্জনের পথ হলো দুটো, এক হলো ভয়, আর আরেকটি সমীহ। আর মাদক পাচারের জগতে কোনোরকম দয়া দেখানোর সুযোগ নেই। এটা হলো ‘সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট’। আর এসকোবারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ধারণা করা হয়, প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার লোকের হত্যার পিছনে এসকোবার দায়ী। তবে খুব কম সময়েই এসকোবার আরেকজনের রক্তে নিজের হাত রাঙাতো। এ কাজের জন্য তার আততায়ী দল প্রস্তুত ছিল। এসকোবার একবার দম্ভুভরে বলেই ফেলেছিলো, “মাঝেমধ্যে আমার নিজেকে ঈশ্বর মনে হয়। আমি যদি বলি কেউ মরবে, সে ঐদিনই মরবে।” তার কারণে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে কলম্বিয়ার ৩ জন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, ৩০ জন বিচারক, কয়েক ডজন সাংবাদিক এবং কম করে হলেও ৪০০ জন পুলিশ অফিসার। সমাজে অবস্থান যা-ই হোক না কেন, তুমি যদি এসকোবারের শত্রু হও, তোমার একমাত্র পরিণতি অকাল মৃত্যু।

কিন্তু এসকোবার জানতো শুধুমাত্র ভয় দেখিয়ে বেশিদিন এই জগতে টিকে থাকা যাবে না। অনেক গ্যাংস্টারকেই মানুষ ভয় পেতো, কিন্তু তারা খুব অল্প বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেছে। এসকোবার জানতো এখানে টিকে থাকতে হলে তাকে কলম্বিয়ার সাধারণ মানুষের মন জয় করতে হবে। আর ঠিক সে কারণেই শুরু হলো এসকোবারের দান করার কর্মসূচি। ১৯৮৯ সালের ফোর্বস ম্যাগাজিন অনুযায়ী, এসকোবার ছিলেন তৎকালীন সময়ের ৭ম ধনী ব্যক্তি, যার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ছিল ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার! বিশাল বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট, বিলাসবহুল দ্রব্য আর সুপারকারের পিছনে খরচ কম করতেন না এসকোবার।

মেডেলিনের সাধারণ জনগণের পিছনেও খরচ করতে শুরু করলেন এসকোবার। গরীব মানুষদেরকে বিনামূল্যে খাওয়া ও থাকার সুযোগ করে দিতেন তিনি। তাছাড়া বাড়িঘর, স্কুল, গির্জা, হাসপাতাল, পার্ক তৈরি তো রয়েছেই। বলা যায়, পুরো একটা লোকালয়ই তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনি। তার এই ‘দয়া’ কপর্দকশূন্য গরীব লোকদের মনে জায়গা করে নিলো। মেডেলিনের দরিদ্র লোকদের কাছে এসকোবার হয়ে উঠলো একজন ‘ভালো ডাকাত’। অবশ্য এর পিছনে কারণও ছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রায় পুরোটা সময় ধরে কলম্বিয়া ডুবে ছিল দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা আর সম্পদের প্রকট বৈষম্যের মধ্যে। ধনী রাজনীতিবিদরা গরীবদেরকে ব্যবহার করলেও গরীবরা কোনোরকম সুযোগ-সুবিধা পায়নি। আর তাই নির্মম পাবলো এসকোবার অনেক কলম্বিয়ানের কাছেই ‘ডন পাবলো’ হিসেবে সম্মান লাভ করেছিলেন। মেডেলিনের সাধারণ জনগণও এসকোবারকে নিজেদের মানুষ ভাবতো।

মেডেলিনের ‘ব্যারিও পাবলো এসকোবার’; Image Source: Medelin City Tours

যদিও, এসকোবারের সমালোচকরা তার এই দাতব্য কর্মসূচিগুলোকে নিছকই ব্যবসার খাতিরে করা হয়েছে বলে মনে করে। বিশাল গরীব জনসমষ্টিকে নিজের ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক নিরাপত্তার জন্যই ব্যবহার করেছিল এসকোবার। ‘জনগণের বন্ধু’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করার জন্য এসকোবার একটি সংবাদ সংস্থাও খুলেছিলেন, যেখানে এসকোবারের ভালো দিক তুলে ধরা হতো।

ধরা হয়, তার কোকেন ব্যবসার জন্য দৈনিক কম করে হলেও ২০ জন কলম্বিয়ান খুন হতো! প্রায় ৫ লক্ষ লোক তার এই ‘আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতি’-র উপর নির্ভরশীল ছিল। তবে সবাই যে নিজের আগ্রহেই ঢুকেছিল এমনটি নয়। সাধারণ কৃষকদেরকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হতো, যদি না তারা আশানুরূপ ককেন উৎপাদন না করতে পারতো, এবং বেশিরভাগেরই এছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। যেসব পুলিশ অফিসার আর রাজনীতিবিদ ঘুষ নিতে অস্বীকৃতি জানাতো, বেশিরভাগই মাথায় গুলি খেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকতো।

১৯৮৯ সালে, প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী লুই কার্লোস গালান ঘোষণা করেন তিনি প্রেসিডেন্ট হলে কলম্বিয়া থেকে মাদকের ব্যবসা সমূলে উৎপাটন করবেন। তার কয়েকদিন পরেই গালানের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। এসকোবারের আদেশে গালানের উত্তরাধিকারী সিজার গ্যাভিরিয়াকেও খুন করার চেষ্টা করা হয়। গ্যাভিরিয়াকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানে বোমা লাগিয়ে দেওয়া হয়। ১০৭ জন যাত্রীর সবাই মারা যায়, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে গ্যাভিরিয়া সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। পরের বছরেই গ্যাভিরিয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন, আর এসকোবারের শাসনের সূর্য অস্তমিত হতে শুরু করে।

এসকোবারের জীবনী নিয়ে নেটফ্লিক্স তৈরি করেছে ‘নারকোস’ সিরিজও; Image Source: Chordify.net

নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই এসকোবার শুধু আন্তর্জাতিক খ্যাতিই লাভ করেননি, বরং একজন আন্তর্জাতিক ‘মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল’-এর তালিকাতেও নাম উঠে গিয়েছিলো। যুক্তরাষ্ট্র এবং কলম্বিয়া যৌথ উদ্যোগে তাকে ধরার জন্য ব্যবস্থা নেয়। ধরা পড়লে কলম্বিয়া সরকার তাকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিবে। কলম্বিয়ার এই আইন পরিবর্তনের জন্য এসকোবার রাজনীতিতেও নাম লেখায়, যদিও তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এতে ব্যর্থ হওয়ার পর এসকোবার ভিন্ন পদ্ধতিতে চেষ্টা করে, তিনি কলম্বিয়ার আন্তর্জাতিক ঋণ পরিশোধ করে দিবেন, যার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার!

অবশেষে ১৯৯১ সালে, এসকোবার সরকারের সাথে চুক্তি করতে সমর্থ হয়। এসকোবার নিজের তৈরি জেলখানায় ৫ বছরের জন্য আটক থাকবেন, যেখানে থাকবে ফুটবল পিচ আর বার, নিজের কারারক্ষী নিজেই ঠিক করবেন, আর পুরো জেলখানায় তিনিই একমাত্র আসামী! সরকার তাতেই রাজি হলো। কিন্তু কিছুদিন পরেই দেখা গেল সেই জেলখানা আসলে ব্যবহৃত হচ্ছে এসকোবারের বিরোধিতা করা লোকদের টর্চার সেল হিসেবে! তারপরে সরকার থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো তাকে সাধারণ কারাগারেই বন্দী করা হবে। ধরা পরার ভয়ে এসকোবার পালালেন এবং লুকিয়ে রইলেন।

তাকে ধরার জন্য সরকার প্রায় ২০০০ জনের বিশাল এক ‘সার্চ ব্লক’ টিম গঠন করলো। এডের সবাই ছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এবং মেডেলিনের ব্যারিওতে এসকোবারের হদিস পাওয়ার আগ পর্যন্ত এই টিম ১৫ হাজারেরও বেশি বাসা তন্নতন্ন করে এসকোবারকে খুঁজেছে। অবশেষে ১৯৯৩ সালের ২ ডিসেম্বর, আজ থেকে ঠিক ২৫ বছর আগে, নিজের ৫৫তম জন্মবার্ষিকীর ১ দিন পর, ব্যারিওর এক বাসার ছাদ থেকে পালানোর সময় গুলি খেয়ে মারা গেলেন এসকোবার। একটি গুলি লেগেছিলো তার পায়ে, একটি বুকে আর শেষটি হলো তার মাথায়। তবে এসকোবারের সঙ্গীসাথিদের মতে, শেষ গুলিটি এসকোবার নিজেই তার মাথায় করেছিলেন। কারণ তিনি একবার বলেছিলেন, “আমি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো জেলখানায় পচার চেয়ে বরং কলম্বিয়ার মাটিতেই শুয়ে থাকবো।”

পরদিন কলম্বিয়ার জাতীয় সংবাদপত্র ‘লা প্রেন্সা’-য় শীর্ষ সংবাদ হিসেবে প্রকাশিত হলো, “কলম্বিয়ার নির্দয় মাদকসম্রাট আর নেই।”

সূত্র: Roar বাংলা

Advertisements

Add comment

Your Header Sidebar area is currently empty. Hurry up and add some widgets.