Home / মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস / রক্তে ভিজে আছে যার বাংলার প্রতিটি বর্ণমালায়।

রক্তে ভিজে আছে যার বাংলার প্রতিটি বর্ণমালায়।

১৮৮৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার রামরাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই মানুষটি আজীবন নিজেকে মাটি মানুষের প্রতিনিধি হিসেবেই চিন্তা করে গেছেন। ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চে নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে জানিয়ে দিয়েছিলেন বাঙ্গালীর স্বায়ত্ত্বশাসনের সূর্য ওঠার কথা।

ধীরেন্দ্রনাথ বাঙ্গালী এবং মাতৃভাষার প্রতি তার সহজাত আবেগ থাকা স্বাভাবিক। পাকিস্তানের গণপরিষদে দাঁড়িয়ে যে তিনি সেই আবেগের প্রতিনিধিত্ব করছেন সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েই তিনি বলেছিলেন।

“So sir, I know I am voicing the sentiments of the vast millions of our state and therefore Bengali should not be treated as provincial language. It should be treated as the language of the state.”

পাকিস্তানের ছয় কোটি নব্বই লক্ষ জনগণের মধ্যে চার কোটি চল্লিশ লক্ষই যে বাংলা ভাষাভাষী এবং পাকিস্তানের রাজকার্যে তাদের ভাষাকে বাদ দিলে সমস্যার সৃষ্টি হবে সেটিও তার বক্তব্যে পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তার বক্তব্য থেকেই প্রথম দাবি ওঠে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার। বাংলার পথে প্রান্তরে ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতাকেই অভিজাত গণপরিষদ সদস্যদের সামনে তুলে ধরেছিলেন তিনি। পাকিস্তানের রাজকার্যে তাদের ভাষাকে বাদ দিলে সমস্যার সৃষ্টি হবে সেটিও তার বক্তব্যে পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। পোস্ট অফিসে মানিঅর্ডার করতে গেলেও যে উর্দু ভাষায় লিখিত ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে হিমশিম খান এই কথাটিই ধীরেন্দ্রনাথের বক্তব্যে প্রতিধ্বনিত হয়েছিলো সেদিন।

ধীরেন্দ্রনাথের আশা ছিলো পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগের নেতারা তার পক্ষে সমর্থন দেবেন। কোনো মুসলমান গণপরিষদ সদস্যই তার এই প্রস্তাবকে আমলে নিলেন না। ঢাকার নবাব পরিবারের সন্তান উর্দুভাষী খাজা নাজিমুদ্দীন সরাসরি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বসলেন।

ভাষা স্বীকৃতিত আন্দলন

লিয়াকত আলী খান এই প্রস্তাবের সূত্র ধরে তাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বলেন,

আসলে যখন সংশোধনী নোটিশটি দেওয়া হয় তখন ভেবেছিলাম এর উদ্দেশ্যটা নির্দোষ। ‘কিছু লোক’ যদি গণপরিষদে ইংরেজি বা উর্দুতে দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের প্রকাশ করতে না পারে তাহলে তারা ওই ভাষায় বক্তব্য পেশ করতে পারেকিন্তু এখন দেখছি আগে যা ভাবছিলাম এই সংশোধনীর উদ্দেশ্য তো তেমন নির্দোষ নয়।”

পাকিস্তানের ভিত্তি যে ধর্মের উপর দাঁড়িয়ে আছে এই জানিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি এই রাষ্ট্রের ধর্মীয় চরিত্র বজায় রাখার জন্য সর্বত্রই উর্দুর প্রাধান্য থাকা প্রয়োজন সেই ব্যাপারে একটি অযৌক্তিক বক্তব্যও দিয়ে দিলেন। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তান গণপরিষদে বাঙ্গালী স্পিকার তমিজউদ্দিন খানও রায় দিতে বাধ্য হলেন প্রস্তাবটি গৃহীত হচ্ছে না। বাঙ্গালীর ভাষার দাবীতে প্রথম যে নিয়মতান্ত্রিক দাবীটি উঠেছিলো তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেলো। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তান গণপরিষদে বাঙ্গালী স্পিকার তমিজউদ্দিন খানও রায় দিতে বাধ্য হলেন প্রস্তাবটি গৃহীত হচ্ছে না।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত করাচি থেকে ঢাকায় ফিরলেন। তেজগাঁ বিমান বন্দরে তার জন্যে অপেক্ষা করছিল এক সংবর্ধনা।

প্রথম গণপরিষদ অধিবেশন শেষে করাচি থেকে ফিরলামঅনুন্নত তেজগাঁ বিমান বন্দরে সিকিউরিটি বলতে কিছুই নেইপ্লেন থেকে নেমে দেখলাম, প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশজন যুবক এক জায়গায় দাঁড়িয়েতাদের প্রত্যেকের গায়ে চাদরআমার ধারণা হলো, গণ-পরিষদে বাংলার সপক্ষে কথা বলার দরুণ এরা বিক্ষোভ জানাতে এসেছে, এদের চাদরের আড়ালে অস্ত্রও থাকতে পারেসংশয় নিয়ে এগিয়ে গেলামযখন ওদের একেবারে নাগালের মধ্যে চলে গেছি তখন হঠাৎ প্রত্যেকে চাদরের তলা থেকে রাশি রাশি ফুল বের করে আমার ওপর বর্ষণ করতে লাগলোওরা সবাই ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।”

এই ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছিলেন।

তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তখন বাঙ্গালীকে একদম ভেতর থেকে নাড়া দিয়েছে।ভাষা সাধারণ মানুষের জীবনের কতটা বড় অংশ জুড়ে থাকে তা হয়তো পাকিস্তানের গণপরিষদের অভিজাতশ্রেণী বুঝতে পারেনি। কিন্তু ধীরেন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন তার দাবী মেনে না নিলে যে এই দাবী রাজপথেই আদায় হবে। বাংলাকে ভাগ করার সিদ্ধান্তেও চরমভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ। তার স্মৃতিকথায় ঠিক এভাবেই লেখা আছে,

পাকিস্তান হওয়ার পর আমার বহু রাজনৈতিক বন্ধু পাকিস্তান ত্যাগ করিয়া ভারতবর্ষে চলিয়া যানত্রিপুরা জেলার বহু কংগ্রেস কর্মী ও বহু লোক পশ্চিমবঙ্গে চলিয়া যানঅভয় আশ্রমের বহু কর্মী পূর্ববঙ্গ ছাড়িয়া পশ্চিমবঙ্গে তাঁহাদের কর্মস্থান ঠিক করিলেন, তাহাতে আমি বহু রাজনৈতিক বন্ধু হারাইলাম, বেদনায় মন ক্লিষ্ট হইয়া গেলকিন্তু পূর্ববঙ্গে থাকিব এই সংকল্প করিয়াছি, সেই জন্য পশ্চিমবঙ্গের বন্ধুবান্ধবের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করিয়া পূর্ববঙ্গে রহিয়া গেলাম।”

কুমিল্লার সেই বাড়ি থেকেই পাকিস্তান হানাদার বাহিনী তাকে ধরে নিয়ে যায়। এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদকে তারা নির্মমভাবে হত্যা করে।

 

এই বর্ষীয়ান শহীদ নেতার প্রতি রইল হাজার হাজার সেলুট।

 

সবাই ভালো থাকুন।

About Rony

mm
যা জানি তা জানাতে চাই ☺

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *