ব্লগ একাত্তর-

রাষ্ট্র গঠনের অধিকার আছে ইসরায়েলের। কী তাৎপর্য আছে: সৌদি যুবরাজের

ইসরায়েলের নিজস্ব ভূমির অধিকার আছে। স্বাভাবিকভাবেই তার বক্তব্যটি মুসলিম বিশ্বে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়ে। সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজকে পাল্টা নিশ্চিত করতে হয় যে, সৌদি আরব ফিলিস্তিনের পাশেই আছে এবং জেরুজালেমকে তারা ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবেই দেখতে চায়। তাহলে প্রিন্স মুহাম্মদ কেন ইসরায়েলের অধিকার বিষয়ক বক্তব্যটি দিয়েছিলেন? কী বোঝাতে চেয়েছিলেন তিনি?

গত ২ এপ্রিল সোমবার, দ্য আটলান্টিকের সাথে দেওয়া তার একটি সাক্ষাৎকারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে প্রিন্স মুহাম্মদ বিভিন্ন মার্কিন পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলের সাথে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি মার্কিন সাময়িকী দ্য আটলান্টিকের সাথেও একটি সাক্ষাৎকার দেন। সে সাক্ষাৎকারেই তিনি ম্যাগাজিনটির সম্পাদক জেফরি গোল্ডবার্গের এর এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, যেকোনো স্থানের প্রতিটি মানুষের তাদের নিজেদের জাতির মধ্যে বসবাস করার অধিকার আছে

তার ভাষায়, “আমি বিশ্বাস করি, নিজেদের ভূমির ওপর ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলিদের অধিকার আছে কিন্তু আমাদের একটি শান্তিচুক্তি থাকতে হবে, যেন সব পক্ষই স্থিতিশীল স্বাভাবিক একটি সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে” ইসরায়েল তার আকারের তুলনায় একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি এবং সৌদি আরবের সাথে ইসরায়েলের বিভিন্ন বিষয়ে অভিন্ন স্বার্থ আছে। তার ভাষায়, “আমি বিশ্বাস করি, নিজেদের ভূমির ওপর ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলিদের অধিকার আছে কিন্তু আমাদের একটি শান্তিচুক্তি থাকতে হবে, যেন সব পক্ষই স্থিতিশীল স্বাভাবিক একটি সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে

সৌদি আরব অবশ্য এখনো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি, বা আনুষ্ঠানিকভাবে দেশ দুটির মধ্যে কোনো সম্পর্কও স্থাপিত হয়নি। কিন্তু উভয় দেশের ক্ষমতাসীন বিভিন্ন নেতার বক্তব্য থেকেই তাদের সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণের চলমান প্রক্রিয়াটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ ৭০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলগামী ভারতীয় এয়ারলাইন্সকে সৌদি আরবের আকাশসীমা ব্যবহার করার অনুমতি দিয়ে সৌদি আরব এই সম্পর্ক স্বাভাবিকীরণের প্রক্রিয়াটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। অনেকেই আশা করছেন, শীঘ্রই হয়তো অন্যান্য দেশের এয়ারলাইন্সকে এবং তার ধারাবাহিকতায় শেষপর্যন্ত ইসরায়েলি এয়ারলাইন্সকেও এ অনুমতি দেওয়া হতে পারে।

পরমাণু শক্তিধর ইরানকে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলে তাদের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। আরব বসন্তের পর সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে ইরানের সরাসরি অংশগ্রহণ এবং লেবানন, ইয়েমেন, ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে সৌদি আরবও তাদের অস্তিত্বের জন্য প্রধান হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। আর তাই ইরানের বিরোধিতা করতে গিয়েই ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে তুলতে আগ্রহী হয়ে উঠছে সৌদি আরব। বিভিন্ন সময় ছোট ছোট পদক্ষেপ এবং বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সে পথেই হাঁটছে তারা। প্রিন্স মুহাম্মদের সাম্প্রতিক বক্তব্যটিও হয়তো সে পথেই একটি পদক্ষেপ।

প্রিন্স মুহাম্মদের ব্যবহৃত বাক্যের গঠন বিন্যাসও এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। পূর্ববর্তী অনেক সৌদি বাদশাহ যেমন বাদশাহ ফাহাদ এবং আব্দুল্লাহও দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের ভিত্তিতে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন, কিন্তু তারা সব সময়ই তার পূর্বে শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন। অন্যান্য রাষ্ট্রও যখনই ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলে, তখন প্রথমেই শর্ত উল্লেখ করে যে, ইসরায়েলকে জেরুজালেম ছেড়ে দিতে হবে এবং ‘৬৭ সালের পূর্বের সীমানায় ফিরে যেতে হবে। সেজন্যই অনেকগুলো মুসলিম রাষ্ট্রই এখন ইসরায়েলের অস্তিত্বকে বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে, যদি ইসরায়েল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের সময় দখল করা ভূমিগুলো এবং পবিত্র জেরুজালেমের দখল ছেড়ে দিতে রাজি থাকে। তারা বাস্তবতার কারণেই ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়ে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে আগ্রহী, কিন্তু তাদের কেউই এটিকে ইসরায়েলের ‘অধিকার’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে না।

মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতায় হয়তো ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনি ভূমি থেকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা সম্ভব হবে না। জাতিসংঘের অস্তিত্ব, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আইনের কারণে তা যৌক্তিকও হবে না। শেষপর্যন্ত সবাইকে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের দিকেই এগিয়ে যেতে হবে এবং ঐতিহাসিক অধিকার না থাকলেও ১৯৬৭ এর পূর্বের সীমান্ত পর্যন্ত ইসরায়েলের যে এক বাস্তবতাপ্রসূত অধিকার সৃষ্টি হয়েছে, সেটিও হয়তো সবাইকে মেনে নিতে হবে।

আরও সংবাদ

Advertisements

Add comment

Your Header Sidebar area is currently empty. Hurry up and add some widgets.