খেলার সংবাদ

বিশ্বকাপের শুরুর দিনগুলো কেমন ছিল? জানতে বিস্তারিত পড়ুন।

শুরুর দিকে কিন্তু বিশ্বকাপ নিয়ে এরকম মাতামাতি ছিল না। আজ যে বিশ্বকাপ খেলতে এত বাছাইপর্বের বাঁধা পার হতে হয় সেই বিশ্বকাপে খেলার আমন্ত্রণই একসময় অনেক দেশ অবলীলায় ফিরিয়ে দিয়েছে! তুচ্ছ ঝামেলাকে কেন্দ্র করে বড় বড় দলগুলো বিশ্বকাপ বয়কট করেছে! তবে ফিফার কর্মকর্তারা থেমে থাকেননি, তাদের নিরলস পরিশ্রমের ফলেই সেই কঠিন সময় কাটিয়ে বিশ্বকাপ হতে পেরেছে দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। প্রতিটি দেশের কাছেই বিশ্বকাপের মর্যাদা অন্যরকম। এই বিশ্বকাপে খেলতে দলগুলোকে দুর্গম পাহাড়ের সমতুল্য বাছাইপর্বের বাঁধা পার করতে হয়।

বিশ্বকাপ শুরুর পূর্বকথা

গ্লাসগোতে ১৮৭২ সালে অনুষ্ঠেয় ইংল্যান্ড বনাম স্কটল্যান্ডের সেই ম্যাচের ফলাফল ছিল গোলশূন্য ড্র। এরপর আস্তে আস্তে বিশ্বব্যাপী ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার কারণেই ১৯০০ ও ১৯০৪ সালের অলিম্পিকে ফুটবল অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে সেটা ছিল প্রদর্শনী খেলা হিসেবে।১৯০৮ সালের অলিম্পিক থেকে ফুটবলের জন্য পদক বরাদ্দ করে দেয় আইওসি। এর ফলে বিশ্বব্যাপী ফুটবলের জনপ্রিয়তা হুহু করে বাড়তে থাকে। এ কারণে একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য ফিফার অভিপ্রায় দিন দিন বাড়তেই থাকে। বিশেষ করে ১৯২১ সালে ফরাসি ফুটবল সংগঠক জুলে রিমে ফিফার সভাপতি হওয়ার পর সেই চেষ্টার পালে নতুন করে হাওয়া দেয়। আইওসি ১৯৩২ সালের অলিম্পিকে ফুটবলকে সংযুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু ফিফা এই সিদ্ধান্ত কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলো না। শেষপর্যন্ত জুলে রিমের আন্তরিক চেষ্টায় ১৯২৮ সালের ২৮শে মে ফিফার কংগ্রেসে ঘোষণা দেওয়া হয়, ১৯৩০ সালে ফিফা নিজেই একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করবে।

১৯৩০ সালে উরুগুয়ে তাদের স্বাধীনতার একশ বছর পূর্তি ধুমধাম করে উদযাপন করতে চাচ্ছিলো। স্বাগতিক হওয়ার জন্যে হাঙ্গেরি, সুইডেন, স্পেন, ইতালি ও নেদারল্যান্ডস আগ্রহী থাকলেও শুরু থেকেই সেই দৌড়ে এগিয়ে ছিল উরুগুয়ে। উরুগুয়ের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন প্রতিযোগী দেশগুলোর যাতায়াত ভাড়া থেকে শুরু করে সবধরনের খরচ বহন করতে রাজি ছিল। অন্য কোনো দেশ এই খরচ বহন করতে রাজি ছিল না, তাই পর্যায়ক্রমে অন্য দেশগুলো আয়োজক হওয়ার দৌড় থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়।

অবশেষে শুরু হলো বিশ্বকাপ

উরুগুয়ের রাজধানী মন্টিভিডিওর তিনটি স্টেডিয়ামেই সেই বিশ্বকাপের সবগুলো ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়! উদ্বোধনী দিনে দুটি ম্যাচ একইসাথে শুরু হয়, ফ্রান্স মুখোমুখি হয় মেক্সিকোর আর বেলজিয়ামের মুখোমুখি হয় যুক্তরাষ্ট্র। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে স্বাগতিক উরুগুয়ের বিশ্বজয়ের মাধ্যমেই প্রথম আসরের সমাপ্তি ঘটে। এই বিশ্বকাপের মাধ্যমে ফুটবলের একটা নতুন অধ্যায়ের দ্বার উন্মোচিত হয়। ফিফার কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় অলিম্পিকের মতো ফুটবল বিশ্বকাপও চার বছর পরপরই অনুষ্ঠিত হবে।

প্রথম বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের খেলোয়াড়েরা

যুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি কাটিয়ে আবারো ফিরলো বিশ্বকাপ

১২ বছর পর ১৯৫০ সালে আবারো বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। ব্রাজিলে অনুষ্ঠেয় এই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ দলগুলো অংশ নেয়। তবে ব্রাজিলের ফুটবল বোর্ডের সাথে ঝামেলার কারণে এই আসরও বয়কট করে আর্জেন্টিনা। মোট ১৩টি দেশ ১৯৫০ বিশ্বকাপে অংশ নেয়। তবে সেই আসরের অন্যতম দুর্বল দিক ছিল অগোছালো ফরম্যাট। ১৯৫০ বিশ্বকাপে কোনো ফাইনাল ম্যাচ ছিল না, চার গ্রুপের চার শীর্ষ দলকে নিয়ে হয়েছিলো সুপার ফোর। সুপার ফোরে যাদের পয়েন্ট বেশি থাকবে তারাই হবে চ্যাম্পিয়ন এটাই ছিল সেই আসরের নিয়ম! ১৯৫৪ বিশ্বকাপে গ্রুপের প্রতিটি দল একে অপরের মুখোমুখি হয়নি, গ্রুপপর্বে প্রতিটি দল তিনটি ম্যাচের বদলে খেলেছিলো দুটি করে ম্যাচ! ১৯৫৮ বিশ্বকাপে এসে এই সমস্যারও অবসান ঘটায় ফিফা।

১৯৫৮ বিশ্বকাপের মাধ্যমেই বিশ্বকাপ আয়োজনে একধরনের স্থিতিশীলতা আসে

তখনো একটি সমস্যা রয়ে গিয়েছিলো, বিশ্বকাপে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকানদের দাপটের কারণে এশিয়া ও আফ্রিকার মতো বিশাল দুই মহাদেশ থেকে খুবই অল্প পরিমাণ দল বিশ্বকাপে সুযোগ পেতো। ফলে এমনও বিশ্বকাপ হয়েছিলো যেখানে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের কোনো প্রতিনিধিই অংশ নিতে পারেনি! এই সমস্যা দূর করার জন্য ফিফা পর্যাক্রমে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ১৬ থেকে ২৪, এরপর ২৪ থেকে ৩২ এ উন্নীত করে। এছাড়া ২০০২ ও ২০১০ বিশ্বকাপ যথাক্রমে এশিয়া ও আফ্রিকায় আয়োজন করেছে ফিফা। ফিফার এসব বুদ্ধিদীপ্ত উদ্যোগের ফলেই দিন যত গিয়েছে ফুটবল বিশ্বকাপের জনপ্রিয়তা ততই বৃদ্ধি পেয়েছে।

আফ্রিকায় বিশ্বকাপ আয়োজন করাটা ফিফার অন্যতম বড় একটি সাফল্য; Image Source : footballtripper

শুরুর দিকে জুলে রিমের সেই লড়াইয়ের ফসল আজকের এই বিশ্বকাপ। জুলে রিমের দেখা সেই স্বপ্ন তখন অনেকের কাছে অলীক কল্পনা মনে হলেও আজ সেই স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। যতদিন এই পৃথিবীতে ফুটবল বেঁচে থাকবে, ততদিন এই পৃথিবী শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে জুলে রিমেকে।

সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমার পোষ্টটি শেষ করছি।

more sports news

Facebook Comments
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top