ব্লগ একাত্তর-

কবিতাঃ দুই বিঘা জমি-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

পাঠের উদ্দেশ্য

এ কবিতা পাঠ করে শিক্ষার্থীরা শোষকশ্রেণির  নিষ্ঠুর শোষণ ও গরিবদের দুর্দশা সম্পর্কে জানতে পারবে। গরিবদের প্রতি তারা সহানুভূতিশীল হবে।

পাঠ-পরিচিতি

‘দুই বিঘা জমি’ একটি কাহিনি-কবিতা। এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কথা ও কাহিনি’ কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলিত। দরিদ্র কৃষক উপেন অভাব-অনটনে বন্ধক দিয়ে তাঁর প্রায় সব জমি হারিয়েছে। বাকি ছিল মাত্র দুই বিঘা জমি। কিন্তু জমিদার তাঁর বাগান বাড়ানোর জন্য সে জমির দখল নিতে চায়। কিন্তু সাত পুরুষের স্মৃতি বিজড়িত সে জমি উপেন দিতে না চাইলে জমিদারের ক্রোধের শিকার হয় সে। মিথ্যে মামলা দিয়ে জমিদার সে জমি দখল করে নেয়। ভিটেছাড়া হয়ে উপেন বাধ্য হয় পথে

বেরুতে। সাধু হয়ে সে গ্রাম-গ্রামান্তরে ঘোরে। কিন্তু পৈতৃক ভিটের স্মৃতি সে ভুলতে পারে না।

একদিন চির-পরিচিত গ্রামে সে ফিরে আসে। গ্রামের অন্য সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও তার ভিটে আজ নিশ্চিহ্ন। কিন্তু হঠাৎ সে লক্ষ করে তার ছোট বেলার স্মৃতি-বিজড়িত সেই আম গাছটি এখনও আছে। সেই আম গাছের ছায়াতলে বসে ক্লান্ত- শ্রান্ত উপেন পরম শান্তি অনুভব করল। তার মনে পড়ল, ঝড়ের দিনে কত না আম সে কুঁড়িয়েছে এখানে। হঠাৎ বাতাসের ঝাপটায় একটা পাকা আম পড়ল তার কোলের কাছে। আম দুটিকে সে জননীর স্নেহের দান মনে করে গ্রহণ করল। কিন্তু তখনই ছুটে এলো মালী। সাধু উপেনকে সে আম-চোর বলে গালাগালি করতে থাকে। উপেনকে জমিদারের নিকট হাজির করা হলো। উপেন জমিদারের কাছে আমটি ভিক্ষা হিসেবে চাইলে জমিদার তাকে সাধুবেশী চোর বলে মিথ্যা অপবাদ দেয়।

এই কবিতার মাধ্যমে কবি দেখাতে চেয়েছেন, সমাজে এক শ্রেণির লুটেরা বিত্তবান প্রবল প্রতাপ নিয়ে বাস করে। তারা সাধারণ মানুষের সম্পদ লুট করে সম্পদশালী হয়। তারা অর্থ, শক্তি ও দাপটের জোরে অন্যায়কে ন্যায়, ন্যায়কে অন্যায় বলে প্রতিষ্ঠা করে। ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাটিতে কবি এদের স্বরূপ তুলে ধরেছেন।

কবিতা:

শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই আর সবই গেছে ঋণে।

বাবু বলিলেন, বুঝেছ উপেন, এ জমি লইব কিনে।

কহিলাম আমি, তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই।

চেয়ে দেখো মোর আছে বড়ো-জোর মরিবার মতো ঠাঁই।

শুনি রাজা কহে, বাপু, জানো তো হে, করেছি বাগানখানা,

পেলে দুই বিঘে প্রস্থ ও দিঘে সমান হইবে টানা-

ওটা দিতে হবে। কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণি

সজল চক্ষে, করুন রক্ষে গরিবের ভিটেখানি।

সপ্ত পুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া,

দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনি লক্ষ্মীছাড়া!

আঁখি করি লাল রাজা ক্ষণকাল রহিল মৌনভাবে,

কহিলেন শেষে ক্রুর হাসি হেসে, আচ্ছা, সে দেখা যাবে।

(৭৯)

পরে মাস দেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে-

করিল ডিক্রি, সকলই বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে।

এ জগতে, হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি –

রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।

মনে ভাবিলাম মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে,

তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল দু বিঘার পরিবর্তে।

সন্ন্যাসীবেশে ফিরি দেশে দেশে হইয়া সাধুর শিষ্য

কত হেরিলাম মনোহর ধাম, কত মনোরম দৃশ্য!

ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে যখন যেখানে ভ্রমি

তবু নিশিদিনে ভুলিতে পারি নে সেই দুই বিঘা জমি।

হাটে মাঠে বাটে এই মতো কাটে বছর পনেরো-ষোল –

একদিন শেষে ফিরিবারে দেশে বড়োই বাসনা হলো।

নমঃনমঃনমঃ সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি!

গঙ্গার তীর, স্নিগ্ধ সমীর, জীবন জুড়ালে তুমি।

অবারিত মাঠ, গগনললাট চুমে তব পদধূলি

ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি।

পল্লবঘন আম্রকানন রাখালের খেলাগেহ,

স্তব্ধ অতল দিঘি কালোজল-নিশীথশীতল স্নেহ।

বুকভরা মধু বঙ্গের বধু জল লয়ে যায় ঘরে-

মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে।

দুই দিন পরে দ্বিতীয় প্রহরে প্রবেশিনু নিজগ্রামে-

কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ছাড়ি রথতলা করি বামে,

রাখি হাটখোলা, নন্দীর গোলা, মন্দির করি পাছে

তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু এসে আমার বাড়ির কাছে।

ধিক ধিক ওরে, শত ধিক তোরে, নিলাজ কুলটা ভূমি!

যখনি যাহার তখনি তাহার, এই কী জননী তুমি!

সে কি মনে হবে একদিন যবে ছিলে দরিদ্রমাতা

আঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া ফল ফুল শাক পাতা!

আজ কোন রীতে কারে ভুলাইতে ধরেছ বিলাসবেশ-

পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা, পুষ্পে খচিত কেশ!

আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগি গৃহহারা সুখহীন-

(৮০)

তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী, হাসিয়া কাটাস দিন।

ধনীর আদরে গরব না ধরে! এতই হয়েছ ভিন্ন

কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সেদিনের কোনো চিহ্ন!

কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ি, ক্ষুধাহরা সুধারাশি!

যত হাসো আজ যত করো সাজ ছিলে দেবী, হলে দাসী।

বিদীর্ণহিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া চারি দিকে চেয়ে দেখি-

প্রাচীরের কাছে এখনো যে আছে, সেই আমগাছ, এ কি!

বসি তার তলে নয়নের জলে শান্ত হইল ব্যথা,

একে একে মনে উদিল স্মরণে বালক-কালের কথা।

সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম,

অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম।

সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর, পাঠশালা পলায়ন-

ভাবিলাম হায় আর কী কোথায় ফিরে পাব সে জীবন!

সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে,

দুটি পাকা ফল লভিল ভূতল আমার কোলের কাছে।

ভাবিলাম মনে বুঝি এতখনে আমারে চিনিল মাতা,

স্নেহের সে দানে বহু সম্মানে বারেক ঠেকানু মাথা।

হেনকালে হায় যমদূত প্রায় কোথা হতে এল মালী,

ঝুঁটি-বাঁধা উড়ে সপ্তম সুরে পাড়িতে লাগিল গালি।

কহিলাম তবে, আমি তো নীরবে দিয়েছি আমার সব-

দুটি ফল তার করি অধিকার, এত তারি কলরব!

চিনিল না মোরে, নিয়ে গেল ধরে কাঁধে তুলি লাঠিগাছ

বাবু ছিপ হাতে পারিষদ সাথে ধরিতে ছিলেন মাছ।

শুনি বিবরণ ক্রোধে তিনি কন, মারিয়া করিব খুন।

বাবু যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ।

আমি কহিলাম, শুধু দুটি আম ভিখ মাগি মহাশয়!

বাবু কহে হেসে বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়।

আমি শুনে হাসি আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে-

তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে!

পোষ্টটি এখনই শেষ করছি। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ্য থাকুন এই কামনায় আমি আমার পোষ্টটি শেষ করিলাম।

Advertisements
mm

Rony

যা জানি তা জানাতে চাই ☺

Add comment

Your Header Sidebar area is currently empty. Hurry up and add some widgets.