ব্লগ একাত্তর-

গৌতম বুদ্ধ (বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা)।

গৌতম বুদ্ধ (বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা)

গৌতম বুদ্ধ ছিলেন একজন শ্রমণ (তপস্বী) ও জ্ঞানী[৪], যাঁর শিক্ষার ভিত্তিতে বৌদ্ধধর্ম প্রবর্তিত হয়। তিনি সিদ্ধার্থ গৌতম, শাক্যমুনি বুদ্ধ বা ‘বুদ্ধ’ উপাধি অনুযায়ী শুধুমাত্র বুদ্ধ নামেও পরিচিত। অনুমান করা হয়, তিনি খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ থেকে ৪র্থ শতাব্দীর মধ্যবর্তী কোনও এক সময়ে প্রাচীন ভারতের পূর্বাঞ্চলে জীবিত ছিলেন এবং শিক্ষাদান করেছিলেন।[৫]

গৌতম বুদ্ধ

ধর্ম: বৌদ্ধধর্ম

ব্যক্তিগত

জন্ম: সিদ্ধার্থ গৌতম
আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৩
অথবা ৪৮০ অব্দ[১][২] লুম্বিনী, শাক্য গণরাজ্য
(বৌদ্ধ মতানুযায়ী)
মৃত্যু: আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৩
অথবা ৪০০ অব্দ (৮০ বছর)
কুশীনগর, মল্ল গণরাজ্য
(বৌদ্ধ মতানুযায়ী)

জ্যেষ্ঠ পোস্টিং

পূর্বসূরী: কস্‌সপ বুদ্ধ
উত্তরসূরী: মৈত্রেয়

পরিবার

দস্পতি: যশোধরা
সন্তান: রাহুল

গৌতম বুদ্ধ ভোগবাসনা চরিতার্থ-করণ এবং তাঁর অঞ্চলে প্রচলিত শ্রমণ আন্দোলনের আদর্শ অনুসারে কঠোর তপস্যার মধ্যে মধ্যপন্থা শিক্ষা দিয়েছিলেন।[৬] পরবর্তীকালে তিনি মগধ ও কোশল সহ পূর্ব ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও শিক্ষাদান করেন।[৫][৭]

গৌতম বুদ্ধ হলেন বৌদ্ধধর্মের কেন্দ্রীয় চরিত্র। বৌদ্ধরা তাঁকে সেই বোধিপ্রাপ্ত বা দিব্য[৮] শিক্ষক মনে করেন, যিনি সম্পূর্ণ বুদ্ধত্ব অর্জন করেছেন এবং নিজের অন্তর্দৃষ্টির কথা সকলকে জানিয়ে চেতন সত্ত্বাদের পুনর্জন্ম ও দুঃখের সমাপ্তি ঘটাতে সাহায্য করেছেন। বৌদ্ধরা বিশ্বাস করেন, গৌতম বুদ্ধের জীবনকাহিনি, কথোপকথনের বিবরণ, সন্ন্যাস নিয়মাবলি তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর অনুগামীরা সূত্রায়িত করেন এবং স্মরণে রাখেন। প্রায় ৪০০ বছর পরে তাঁর উপদেশ হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন সংকলন মৌখিক প্রথা থেকে প্রথম লিপিবদ্ধ হয়।

ঐতিহাসিক সিদ্ধার্থ গৌতম

বুদ্ধের জীবনের ঐতিহাসিক তথ্য সম্পর্কে কোনও প্রকার দুর্বল দাবি উত্থাপন করতে গবেষকরা দ্বিধাবোধ করেন। তাঁদের অধিকাংশই মেনে নিয়েছেন যে, বুদ্ধ মহাজনপদের যুগে মগধ সাম্রাজ্যের শাসক বিম্বিসারের রাজত্বকালে জীবিত ছিলেন, শিক্ষাদান করেছিলেন এবং একটি ভিক্ষু সংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন (আনু. 558 – আনু. 491 BCE),[৯][১০] তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বিম্বিসারের উত্তরসূরি অজাতসত্তুর শাসনকালের প্রথম দিকে। সেই হিসেবে বুদ্ধ ছিলেন জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীরের কনিষ্ঠ সমসাময়িক।[১১][১২] বৈদিক ব্রাহ্মণ্যবাদ ছাড়াও বুদ্ধের জীবন ছিল আজীবক, চার্বাক, জৈনধর্ম ও অঞ্জন প্রভৃতি প্রভাবশালী শ্রমণ চিন্তাধারার উদয়কালের সমসাময়িক।[১৩] ব্রহ্মজল সুত্ত গ্রন্থে এই ধরনের বাষট্টিটি মতবাদের কথা বিবৃত হয়েছে। সেই যুগেই মহাবীর, পূরণ কস্সপ, মক্খলি গোসাল, অজিত কেশকম্বলী, পকুধ কচ্চায়ন, সঞ্জয় বেলট্ঠিপুত্ত প্রমুখ প্রভাবশালী দার্শনিক তাঁদের মত প্রচার করেছিলেন। সামান্নফল সুত্ত গ্রন্থের এঁদের কথা উল্লিখিত হয়েছে। বুদ্ধ নিশ্চয় এঁদের মতবাদ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন।[১৪][১৫] বুদ্ধের প্রধান দুই শিষ্য সারিপুত্ত ও মোগ্‌গল্লান প্রথম জীবনে ছিলেন সংশয়বাদী সঞ্জয় বেলট্ঠিপুত্তর প্রধান শিষ্য।[১৬] তিপিটকে প্রায়শই দেখা যায় যে, বুদ্ধ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মতধারার সমর্থকদের সঙ্গে বিতর্কে অংশ নিচ্ছেন। অর্থাৎ, বুদ্ধ নিজেও ছিলেন সমসাময়িক কালের অন্যতম শ্রমণ দার্শনিক।[১৭] এমনও প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে যে আলার কালাম ও উদ্দক রামপুত্ত নামে দুই দার্শনিকও ঐতিহাসিক চরিত্র। খুব সম্ভবত এঁরা বুদ্ধকে ধ্যানের দুটি ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছিলেন।[১৮] বুদ্ধের জীবনকথায় “জন্ম, বয়ঃপ্রাপ্তি, সন্ন্যাসগ্রহণ, আধাত্মিক অনুসন্ধান, বোধিলাভ, শিক্ষাদান ও মৃত্যু”র ধারাটি সাধারণভাবে স্বীকৃত হলেও, প্রথাগত জীবনীগ্রন্থগুলিতে বিভিন্ন বিবরণের সত্যতা সম্পর্কে মতৈক্য খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায়।[১৯][২০]

গৌতম বুদ্ধের জন্ম ও মৃত্যুর সময়কাল সম্বন্ধে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিককার অধিকাংশ ঐতিহাসিক ৫৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৪৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে তাঁর জীবনকাল হিসেবে নিরূপণ করেন।[১][২১] ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে বুদ্ধের জীবনীর ওপর আয়োজিত একটি সম্মেলনে অধিকাংশের বক্তৃতায় ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের নিকটবর্তী বছরগুলির মধ্যে বুদ্ধের মৃত্যুর সময়কাল বলে নিরূপণ করেন।[১][২২][পাদটীকা ২] এই বিকল্প মতবাদগুলি সমস্ত ঐতিহাসিকদের দ্বারা স্বীকৃত নয়।[২৭][২৮]

প্রাচীন গ্রন্থগুলি থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সিদ্ধার্থ গৌতম শাক্য জনগোষ্ঠীতে জন্মগ্রহণ করেন। এই গোষ্ঠী খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মূল ভূখন্ড থেকে সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক ভাবে কিছুটা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় একটি ক্ষুদ্র গণতন্ত্র বা গোষ্ঠীতন্ত্র হিসেবে শাসন করত।[৩০] সিদ্ধার্থ গৌতমের পিতা শুদ্ধোধন একজন নির্বাচিত গোষ্ঠীপতি ছিলেন, যার ওপর রাজ্যশাসনের দায়িত্ব ছিল।[৩০] বৌদ্ধ ঐতিহ্যানুসারে, গৌতম অধুনা নেপালের লুম্বিনী নগরে জন্মগ্রহণ করেন ও কপিলাবস্তুতে বড় হয়ে ওঠেন।

গৌতমের সময়কাল বা তাঁর মৃত্যুর কয়েক শতাব্দীর পর পর্যন্ত তাঁর সম্বন্ধে কোন লিখিত তথ্যসূত্র পাওয়া যায় না। প্রায় দুই শতাব্দী পরে সম্রাট অশোক গৌতমের জন্মস্থানে তীর্থ করতে গিয়ে লুম্বিনীতে স্তম্ভ স্থাপন করেন। তাঁর অন্য একটি স্তম্ভে বিভিন্ন ধম্ম পুথির উল্লেখ রয়েছে, যার দ্বারা মৌর্য যুগে লিখিত বৌদ্ধ ঐতিহ্যের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। পূর্ব আফগানিস্তানের জালালাবাদের নিকটে হাড্ডা হতে আবিষ্কৃত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় থেকে প্রথম শতাব্দীতে গান্ধারী ভাষায় রচিত ও খরোষ্ঠী লিপিতে লিখিত সাতাশটি বার্চের ছালের গান্ধার বৌদ্ধ পুঁথিগুলি বর্তমানে টিকে থাকা বৌদ্ধ পুঁথিগুলির মধ্যে প্রাচীনতম।

জীবনীগ্রন্থ

বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী ঐতিহ্যশালী জীবনীগ্রন্থগুলি সিদ্ধার্থ গৌতমের জীবনীর উৎস।[৪২] এর মধ্যে দ্বিতীয় শতাব্দীতে [৪২] অশ্বঘোষ দ্বারা রচিত বুদ্ধচরিত[৪৩][৪৪][৪৫] নামক মহাকাব্যটি বুদ্ধের প্রথম পূর্ণ জীবনীগ্রন্থ। তৃতীয় শতকে রচিত ললিতবিস্তার সূত্র গৌতম বুদ্ধের জীবনী নিয়ে লিখিত পরবর্তী গ্রন্থ।[৪৬] সম্ভবতঃ চতুর্থ শতাব্দীতে রচিত মহাসাঙ্ঘিক লোকোত্তরবাদ ঐতিহ্যের মহাবস্তু গ্রন্থটি অপর একটি প্রধান জীবনী গ্রন্থ হিসেবে পরিগণিত হয়।[৪৬] তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীতে রচিত ধর্মগুপ্তক ঐতিহ্যের অভিনিষ্ক্রমণ সূত্র গ্রন্থটি বুদ্ধের একটি বিরাট জীবনীগ্রন্থ।[৪৭] সর্বশেষে পঞ্চম শতাব্দীতে রচিত বুদ্ধঘোষ রচিত থেরবাদ ঐতিহ্যের নিদানকথা উল্লেখ্য।[৪৮] ত্রিপিটকের অংশ হিসেবে জাতক,[৪৯] মহাপদন সূত্ত ও আচারিয়াভুত সুত্তে বুদ্ধের পূর্ণ জীবনী না থাকলেও কিছু নির্বাচিত অংশ রয়েছে।।

এই সমস্ত ঐতিহ্যশালী জীবনীগ্রন্থে সাধারণতঃ অলৌকিক ও অতিপ্রাকৃত কাহিনীতে পরিপূর্ণ। মহাবস্তু প্রভৃতি গ্রন্থে বুদ্ধকে লোকোত্তর সর্বোৎকৃষ্ট চরিত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যিনি জাগতিক বিশ্বের সমস্ত ভার থেকে মুক্ত।[৫০][৫১][৫২] কিন্তু তা হলেও এই সমস্ত গ্রন্থ থেকে খুটিনাটি সাধারণ বিবরণগুলিকে একত্র করে ও অলৌকিক কল্পকাহিনীগুলিকে অপসারণ করে বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন দিক সম্বন্ধে আলোকপাত সম্ভব হয়েছে।

প্রাচীন যুগের ভারতীয়রা ইতিহাস ও কালপঞ্জীর ব্যাপারে নির্লিপ্ত ছিলেন, বরং তাঁরা দর্শনের ওপর বেশি মনোযোগী ছিলেন। বৌদ্ধ গ্রন্থগুলিতে এই ধারার চিত্র লক্ষ্য করা যায়, যেখানে তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি সম্বন্ধে যত বা উল্লেখ রয়েছে, তাঁর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে তাঁর শিক্ষা ও দর্শনের বর্ণনা করা হয়েছে। এই গ্রন্থগুলিতে প্রাচীন ভারতের সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবন সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়।[৫৩] যাই হোক না কেন, অলৌকিক কল্প কাহিনীর মধ্যে থেকে খুব কম তথ্যই ইতিহাস নির্ভর হলেও গৌতম বুদ্ধের ঐতিহাসিকতা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।[৫৪]

জীবনী

প্রথম জীবন

সিদ্ধার্থ গৌতম শাক্য প্রজাতন্ত্রের নির্বাচিত প্রধান[৫] ক্ষত্রিয় বংশের[৫৫][৫৬] শুদ্ধোধনের পুত্র ছিলেন। তাঁর মাতা মায়াদেবী কোলিয় গণের রাজকন্যা ছিলেন। শাক্যদের প্রথা অনুসারে গর্ভাবস্থায় মায়াদেবী শ্বশুরালয় কপিলাবস্তু থেকে পিতৃরাজ্যে যাবার পথে অধুনা নেপালের তরাই অঞ্চলেরে অন্তর্গত লুম্বিনী গ্রামে এক শালগাছের তলায় সিদ্ধার্থের জন্ম দেন। তাঁর জন্মের সময় বা সপ্তম দিনে মায়াদেবীর জীবনাবসান হয়। শুদ্ধোধন শিশুর জন্মের পঞ্চম দিনে নামকরণের জন্য আটজন ব্রাহ্মণকে আমন্ত্রণ জানালে তাঁরা শিশুর নাম রাখেন সিদ্ধার্থ অর্থাৎ যিনি সিদ্ধিলাভ করেছেন।[৫৭] এই সময় পর্বতদেশ থেকে আগত অসিত নাম একজন সাধু নবজাত শিশুকে দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে এই শিশু পরবর্তীকালে একজন রাজচক্রবর্তী অথবা একজন সিদ্ধ সাধক হবেন।[৫৭] একমাত্র সর্বকনিষ্ঠ আমন্ত্রিত ব্রাহ্মণ কৌণ্ডিন্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই শিশু পরবর্তীকালে বুদ্ধত্ব লাভ করবেন।[৫৮] মাতার মৃত্যুর পর তিনি বিমাতা মহাপজাপতি গোতমী কর্তৃক লালিত হন।[৫৯] ষোলো বছর বয়সে তাঁকে সংসারের প্রতি মনোযোগী করার জন্য তাঁর পিতামাতা তাঁকে কোলিয় গণের সুন্দরী কন্যা যশোধরার সাথে বিবাহ দেন ও রাহুল নামক এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। সিদ্ধার্থ তাঁর জীবনের প্রথম উনত্রিশ বছর রাজপুত্র হিসেবে অতিবাহিত করেন। বৌদ্ধ পুঁথিগুলি অনুসারে পিতা শুদ্ধোধন তাঁর জীবনে বিলাসিতার সমস্ত রকম ব্যবস্থা করা সত্ত্বেও সিদ্ধার্থ বস্তুগত ঐশ্বর্য্য যে জীবনের লক্ষ্য হতে পারে না, তা উপলব্ধি করা শুরু করেন।[৫৯]

মহাভিনিষ্ক্রমণ

কথিত আছে, উনত্রিশ বছর বয়সে রাজকুমার সিদ্ধার্থ প্রাসাদ থেকে কয়েকবার ভ্রমণে বেরোলে তিনি একজন বৃদ্ধ মানুষ, একজন অসুস্থ মানুষ, একজন মৃত মানুষ ও একজন সন্ন্যাসীকে দেখতে পান। সাংসারিক দুঃখ কষ্টে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ সিদ্ধার্থ তাঁর সারথি ছন্নকে এঁদের প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে, ছন্ন তাঁকে বুঝিয়ে বলেন যে সকল মানুষের নিয়তি যে তাঁরা একসময় বৃদ্ধ, অসুস্থ হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হবে। মুণ্ডিতমস্তক পীতবর্ণের জীর্ণ বাস পরিহিত সন্ন্যাসী সম্বন্ধে ছন্ন তাঁকে বলেন, যে তিনি মানুষের দুঃখের জন্য নিজ গার্হস্থ্য জীবন ত্যাগ করেছেন, তিনিই সন্ন্যাসী। এই নূতন অভিজ্ঞতায় বিষাদগ্রস্ত সিদ্ধার্থ বাধর্ক্য, জরা ও মৃত্যুকে জয় করার জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে একজন সন্ন্যাসীর জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নেন।[৬০] সংসারের প্রতি বীতরাগ সিদ্ধার্থ এক রাত্রে ঘুমন্ত স্ত্রী, পুত্র, পরিবারকে নিঃশব্দ বিদায় জানিয়ে প্রিয় অশ্ব কন্থক ও সারথি ছন্নকে নিয়ে প্রাসাদ ত্যাগ করেন। প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে বনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে রাজবস্ত্র ত্যাগ করে তলোয়ার দিয়ে তাঁর লম্বা চুল কেটে মুণ্ডিতমস্তক হন। এরপর কন্থক ও ছন্নকে বিদায় জানিয়ে রাজগৃহের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

বোধিলাভ

প্রথমে তিনি আলার কালাম নামক একজন সন্ন্যাসীর নিকট যোগ শিক্ষা করেন।[৬১][৬২][৬৩] কিন্তু তাঁর প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর লাভ না করায় এরপর তিনি উদ্দক রামপুত্ত নামক অপর একজন সন্ন্যাসীর নিকট শিষ্যত্ব গ্রহণ করে যোগশিক্ষা লাভ করেন।[৬৪] কিন্তু এখানেও তাঁর জিজ্ঞাসা পূরণ না হওয়ায় তিনি তাঁকে ত্যাগ করে[৬৫] বুদ্ধগয়ার নিকট উরুবিল্ব নামক একটি রম্য স্থানে গমন করেন।

শরীরকে অপরিসীম কষ্ট প্রদানের মাধ্যমে মুক্তিলাভ হয় এই বিশ্বাসে তিনি ও অন্য পাঁচজন তপস্বী ছয় বছর ধরে অনশন, শারীরিক নিপীড়ন ও কঠোর সাধনায় অতিবাহিত করেন। দীর্ঘকাল ধরে কঠোর তপস্যার পর তাঁর শরীর অস্থিচর্মসার হয়ে পড়ে ও তাঁর অঙ্গসঞ্চালনের ক্ষমতা কমে গিয়ে তিনি মরণাপন্ন হলে তাঁর উপলব্ধি হয় যে, অনশনক্লিষ্ট দুর্বল দেহে শরীরকে অপরিসীম কষ্ট দিয়ে কঠোর তপস্যা করে বোধিলাভ সম্ভব নয়।[web ৯] ধর্মচক্রপ্রবর্তন সূত্রানুসারে[web ৯], অসংযত বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং কঠোর তপস্যার মধ্যবর্তী একটি মধ্যম পথের সন্ধান করে বোধিলাভ সম্ভব বলে তিনি উপলব্ধি করেন।[web ৯] তিনি তাই আবার খাদ্য গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেন ও সুজাতা নাম্নী এক স্থানীয় গ্রাম্য কন্যার কাছ থেকে তিনি এক পাত্র পরমান্ন আহার করেন।[web ১০] সিদ্ধার্থকে খাদ্য গ্রহণ করতে দেখে তাঁর পাঁচজন সঙ্গী তাঁর ওপর বিরক্ত হয়ে তাঁকে ছেড়ে চলে যান।

এই ঘটনার পরে একটি অশ্বত্থ গাছের তলায় তিনি ধ্যানে বসেন এবং সত্যলাভ না করে স্থানত্যাগ করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেন।[৬৬] উনপঞ্চাশ দিন ধরে ধ্যান করার পর তিনি বোধি প্রাপ্ত হন।[৬৬][web ১১] এই সময় তিনি মানব জীবনে দুঃখ ও তাঁর কারণ এবং দুঃখ নিবারণের উপায় সম্বন্ধে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেন, যা চতুরার্য সত্য নামে খ্যাত হয়।[web ১১] তাঁর মতে এই সত্য সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করলে মুক্তি বা নির্বাণ লাভ সম্ভব।

ধর্মপ্রচার

বোধিলাভের পর গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে তপুস্স ও ভল্লিক নামক বলখ অঞ্চলের দুইজন ব্যবসায়ীর সাক্ষাত হহয়, যারা তাঁকে মধু ও বার্লি নিবেদন করেন। এই দুইজন বুদ্ধের প্রথম সাধারণ শিষ্য। বুদ্ধ তার প্রাক্তন শিক্ষক আলার কালাম ও উদ্দক রামপুত্তের সাথে সাক্ষাত করে তাঁর নবলব্ধ জ্ঞানের কথা আলোচনার জন্য উৎসাহী ছিলেন, কিন্তু তাঁদের দুইজনেরই ততদিনে জীবনাবসান হয়ে গেছিল। এরপর তিনি বারাণসীর নিকট ঋষিপতনের মৃগ উদ্যানে যাত্রা করে তাঁর সাধনার সময়ের পাঁচ প্রাক্তন সঙ্গী, যারা তাঁকে একসম পরিত্যাগ করেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন ও তাঁদেরকে তাঁর প্রথম শিক্ষা প্রদান করেন, যা বৌদ্ধ ঐতিহ্যে ধর্মচক্রপ্রবর্তন নামে খ্যাত। এই ভাবে তাঁদের নিয়ে ইতিহাসের প্রথম বৌদ্ধ সংঘ গঠিত হয়।

এরপর মহাকশ্যপ নামক এক অগ্নি-উপাসক ব্রাহ্মণ ও তাঁর অনুগামীরা সংঘে যোগদান করেন। বুদ্ধ সম্রাট বিম্বিসারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিমতো বুদ্ধত্ব লাভের পরে রাজগৃহ যাত্রা করলে সঞ্জয় বেলাঢ্বিপুত্তের দুইজন শিষ্য সারিপুত্ত ও মৌদ্গল্যায়ন সংঘে যোগদান করেন। বুদ্ধত্ব লাভের এক বছর পরে শুদ্ধোধন তাঁর পুত্রকে কপিলাবস্তু শহরে আমন্ত্রণ জানান। একদা রাজপুত্র গৌতম রাজধানীতে সংঘের সাথে ভিক্ষা করে খাদ্য সংগ্রহ করেন। কপিলাবস্তুতে তাঁর পুত্র রাহুল তাঁর নিকট শ্রমণের দীক্ষাগ্রহণ করেন। এছাড়া আনন্দ ও অনুরুদ্ধ নামক তাঁর দুইজন আত্মীয় তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। মহাকশ্যপ, সারিপুত্ত, মৌদ্গল্যায়ন, আনন্দ, অনুরুদ্ধ ও রাহুল ছাড়াও উপলি, মহাকাত্যায়ন, পুণ্ণ ও সুভূতি বুদ্ধের দশজন প্রধান শিষ্য ছিলেন।

তিন বছর পরে রোহিণী নদীর জলের অংশ নিয়ে শাক্যদের সাথে কোলীয় গণের একটি বিবাদ উপস্থিত হলে বুদ্ধ সেই বিবাদের মীমাংসা করেন। এর কয়েকদিনের মধ্যে শুদ্ধোধন মৃত্যুবরণ করলে গৌতম বুদ্ধের বিমাতা মহাপজাপতি গোতমী সংঘে যোগদানে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। গৌতম প্রথমে নারীদের সংঘে যোগদানের ব্যাপারে অমত প্রকাশ করলেও আনন্দের উৎসাহে তিনি সংঘ গঠনের পাঁচ বছর পরে সংঘে নারীদের ভিক্ষুণী হিসেবে প্রবেশের অনুমতি দেন।

মহাপরিনির্বাণ

মহাপরিনিব্বাণ সুত্ত অনুসারে গৌতম বুদ্ধের বয়স যখন আশি বছর, তখন তিনি তাঁর আসন্ন মৃত্যুর কথা ঘোষণা করেন। পওয়া নামক একটি স্থানে অবস্থান করার সময় চণ্ড নামক এক কামার তাঁকে ভাত ও শূকরমদ্দভ ইত্যাদি খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। এই খাবার খাওয়ার পরে গৌতম আমাশয় দ্বারা আক্রান্ত হন। চণ্ডের দেওয়া খাবার যে তাঁর মৃত্যু কারণ নয়, আনন্দ যাতে তা চণ্ডকে বোঝান, সেই ব্যাপারে বুদ্ধ নির্দেশ দেন। [web ১২] এরপর আনন্দের আপত্তি সত্ত্বেও অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় তিনি কুশীনগর যাত্রা করেন। এইখানে তিনি আনন্দকে নির্দেশ দেন যাতে দুইটি শাল বৃক্ষের মধ্যের একটি জমিতে একটি কাপড় বিছিয়ে তাঁকে যেন শুইয়ে দেওয়া হয়। এরপর শায়িত অবস্থায় বুদ্ধ উপস্থিত সকল ভিক্ষু ও সাধারণ মানুষকে তাঁর শেষ উপদেশ প্রদান করেন। তাঁর অন্তিম বাণী ছিল “বয়ধম্মা সঙ্খারা অপ্পমাদেন সম্পাদেথা”, অর্থাৎ “সকল জাগতিক বস্তুর বিনাশ আছে। অধ্যবসায়ের সাথে আপনার মুক্তির জন্য সংগ্রাম কর।”

বিভিন্ন পুঁথিতে অনুবাদবিভ্রাট ও লিখনশৈলীর পার্থক্যের জন্য গৌতম বুদ্ধের অন্তিম আহার্য্য বস্তু সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না। আর্থার ওয়েলির মতে থেরবাদ ঐতিহ্যানুসারে শূকরমদ্দভ বলতে শূকরের নরম মাংস বোঝানো হয়। যদিও কার্ল ইউজিন নিউম্যান এই শদের অর্থ করেছেন শূকরের নরম আহার। নিউম্যান ও ওয়েলি আবার এও মত প্রকাশ করেছেন যে এই আহারের সাথে শূকর শব্দটি যুক্ত হলেও হয়তো এটি একটি শুধুমাত্র একটি উদ্ভিদ, যাকে আহার হিসেবে ব্যবহার করা হত। পরবর্তীকালে কয়েক শতাব্দী পরে বুদ্ধের জীবনী রচনার সময় এই শব্দের অর্থ সাধারণ ব্যবহারে অপ্রচলিত হয়ে পড়ায় শূকরমদ্দভ শব্দটি শূকরের নরম মাংস হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।[৬৭] অস্কার ভন হিনুবার মত প্রকাশ করেছেন যে, বুদ্ধের মৃত্যু খাদ্যে বিষক্রিয়ার মাধ্যমে হয় নি, বরং সুপিরিয়র মেসেন্ট্রিক আর্টারি সিন্ড্রোম নামক বার্ধক্যের সময়ের একটি রোগের কারণে হয়েছিল।[৬৮][web ১৩]

দীপবংশ ও মহাবংশ নামক শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থানুসারে, বুদ্ধের মৃত্যুর ২১৮ বছর পরে সম্রাট অশোকের রাজ্যাভিষেক হয়, সেই অনুযায়ী ৪৮৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বুদ্ধের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে চীনা পুঁথি (十八部論 ও 部執異論) অনুসারে, বুদ্ধের মৃত্যুর ১১৬ বছর পরে অশোকের রাজ্যাভিষেক হয়, সেই অনুযায়ী ৩৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বুদ্ধের মৃত্যু হয়। যাই হোক, থেরবাদ বৌদ্ধ ঐতিহ্যে ৫৪৪ বা ৫৪৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ ঘটে বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মায়ানমারের বৌদ্ধরা ৫৪৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ১৩ই মে[৬৯] এবং থাইল্যান্ডের বৌদ্ধরা ৫৪৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ১১ই মার্চ বুদ্ধের মৃত্যুদিবস বলে মনে করেন।[৭০]

তথ্যসূত্র

Cousins 1996, পৃ. 57–63।
Norman 1997, পৃ. 33।
“Maha-parinibbana Sutta”, Digha Nikaya (16), Access insight, part 5
Baroni 2002, পৃ. 230।
Warder 2000, পৃ. 45।
Laumakis 2008, পৃ. 4।
Skilton 2004, পৃ. 41।
Guang Xing (2005). The Three Bodies of the Buddha: The Origin and Development of the Trikaya Theory. Oxford: Routledge Curzon: pp.1 and 85
Rawlinson, Hugh George. (1950) A Concise History of the Indian People, Oxford University Press. p. 46.
Muller, F. Max. (2001) The Dhammapada And Sutta-nipata, Routledge (UK). p. xlvii. ISBN 0-7007-1548-7.
Smith 1924, পৃ. 34, 48।
Schumann 2003, পৃ. 1-5।
Jayatilleke 1963, chpt. 1-3।
Walshe 1995, পৃ. 268।
Collins 2009, পৃ. 199–200।
Nakamura 1980, পৃ. 20।
Warder 1998, পৃ. 45।
Wynne 2007, পৃ. 8–23, ch. 2।
Buswell 2003, পৃ. 352।
Lopez 1995, পৃ. 16।
Schumann 2003, পৃ. 10–13।
Prebish 2008, পৃ. 2।
Gombrich 1992।
Uni. Heidelberg.
Hartmann 1991।
Gombrich 2000।
Schumann 2003, পৃ. xv।
Wayman 1993, পৃ. 37–58।
Samuels 2010, পৃ. 140–52।
Gombrich 1988, পৃ. 49।
Gethin 1998, পৃ. 19।
Mahāpātra 1977।
Mohāpātra 2000, পৃ. 114।
Tripathy 2014।
Hartmann 1991, পৃ. 38–39।
Keown ও Prebish 2013, পৃ. 436।
Walsh 1995, পৃ. 20।
Gethin 1998, পৃ. 14।
Nakamura 1980, পৃ. 18।
Huntington 1986।
Dhammika 1993।
Fowler 2005, পৃ. 32।
Beal 1883।
Cowell 1894।
Willemen 2009।
Karetzky 2000, পৃ. xxi।
Beal 1875।
Swearer 2004, পৃ. 177।
Schober 2002, পৃ. 20।
Jones 1949।
Jones 1952।
Jones 1956।
Carrithers 2001, পৃ. 15।
Armstrong 2000, পৃ. xii।
Samuel 2010।
Hiltebeitel 2002।
Narada 1992, পৃ. 9–12।
Narada 1992, পৃ. 11-12।
Narada 1992, পৃ. 14।
Conze 1959, পৃ. 39-40।
Upadhyaya 1971, পৃ. 95।
Laumakis 2008, পৃ. 8।
Grubin 2010।
Armstrong 2004, পৃ. 77।
Narada 1992, পৃ. 19-20।
Gyatso 2007, পৃ. 8–9।
Waley 1932, পৃ. 343–54।
Mettanando 2000।
Kala 1724, পৃ. 39।
Eade 1995, পৃ. 15–16।

Advertisements

Add comment

Your Header Sidebar area is currently empty. Hurry up and add some widgets.