আগ্রা-দিল্লি ঘুরে: মুঘলদের ব্যাপার-স্যাপারই অন্য রকম। আলিশান কায়-কারবার। বিরাট বিরাট স্থাপনা। বিশাল আয়োজন। মধ্য এশিয়ার তুর্কি-ইরানি ঐতিহ্যের ছাপ।

ভারতকে মুঘলরা তাদের কয়েক শতকের শাসনে রাজসিক স্থাপত্য, বিপুল নির্মাণ আর শৈল্পিক সুষমায় ভরপুর করেছে। আগ্রা, ফতেহপুর সিক্রি, দিল্লি ছাড়াও উপমহাদেশের নানা স্থানে মুঘল কৃতিত্ব এখনও মানুষকে মোহিত করে।

বিশ্বের আশ্চর্যজনক দ্রষ্টব্য রূপে তাজমহল, আগ্রার দূর্গ, বুলন্দ দরওয়াজা, দেওয়ান-ই-খাস, দেওয়ান-ই-আম, লালকেল্লা, জামে মসজিদ আজও বিস্ময় জাগায়। একেকটি নির্মাণ এতো বিরাট যে খুঁটিয়ে দেখলে সারা দিনেও শেষ হয় না।

বিশালত্বের পাশাপাশি শৈল্পিক কারুকাজ আর সৌন্দর্যের দিক থেকে মুঘল ঐতিহ্য অতুলনীয়। সূক্ষ্ম কাজ, কাঠামোর বিন্যাস, আগাগোড়া ছন্দের ভারসাম্য মুঘল স্থাপনাকে নান্দনিক গৌরবে ভূষিত করেছে।

সেই বিশাল ও বড় মাপের নির্মাণ কাজের নৈপুণ্যের পাশাপাশি মুঘলরা ছোট ছোট অতি সূক্ষ্ম শিল্পকর্মের নিদর্শনও রেখেছেন। মুঘলদের অসামান্য কৃতিত্ব হলো ‘বিন্দুতে সিন্ধু’ রচনা, যার নাম মিনিয়েচার পেইন্টিং। 

মিনিয়েচার পেইন্টিং-এর আক্ষরিক অর্থ ক্ষুদ্র চিত্র বা অনুচিত্র। তবে মূলগত দিক থেকে মিনিয়েচার শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ভাষা থেকে, যার অর্থ লাল মেঠো সিঁদুর। ঐতিহাসিকভাবে মধ্যযুগের ইউরোপে লাল মেঠো সিঁদুর দিয়ে পুস্তক বা পুঁথি ইত্যাদিতে চিত্রাবলী সংযোজনের প্রচলন ছিল। বইয়ের টেক্সটের মধ্যে অতি ক্ষুদ্র ও সূক্ষ্ম চিত্র দিয়ে বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাবে তুলে ধরার এই রীতিতে ছোট্ট পরিসরে শৈল্পিক নৈপুণ্যের ছাপ দেখতে পাওয়া যায়।

ভারতে মুঘল আমলে অনেক বিখ্যাত মিনিয়েচার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়ার এই চিত্রকর্ম মুঘলদের প্রবর্তিত, যা মূলত ক্ষুদ্র চিত্রশিল্প এবং যাকে বই হিসাবে অথবা ব্যক্তিগত অ্যালবাম হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে৷ চিত্রশিল্পটিতে পারস্যের চিত্রশিল্পের প্রভাব রয়েছে এবং তা  বৃহত্তর তুর্কি-চীনা চিত্রশিল্প দ্বারা প্রভাবিত৷

মুঘলরা ইরানি, পারসিয়ান, তুর্কি, চীনা ঐতিহ্যের সঙ্গে  ভারতের হিন্দু, জৈন ও বৌদ্ধ চিত্র শিল্পকলার  মিশ্রণ ঘটিয়ে অপূর্ব ও অভিনব মুঘল মিনিয়েচার উদ্ভব করেন, যা সারা বিশ্বে অনন্য ও অভিনব রূপে নন্দিত।  ১৬ শতক থেকে ১৮ শতক পর্যন্ত সময়কালে  মিনিয়েচার চিত্রের স্বর্ণযুগ বিরাজমান ছিল, যা ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া ছাড়িয়ে সারা পৃথিবীতে বিস্তৃতি লাভ করে৷ শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যেও এ চিত্রশিল্পের চর্চা লক্ষ্য করা যায়৷

মুঘল মিনিয়েচার চিত্রশিল্প পারস্য এবং ভারতের চিত্রশিল্পের এক ধরণের মিশ্রণ হলেও তা আগে থেকেই দিল্লির তুর্কী-আফগান সুলতানাতে প্রচলিত ছিল। দিল্লির মুসলিমদের মধ্যে ক্ষুদ্র চিত্রশিল্পের চর্চা ছিল, যা মুঘল সম্প্রদায়ের মাধ্যমে অধিগৃহিত হয়৷

মুঘলদের মতোই মধ্য এশিয়ার অন্যান্য বিজয়ী শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে বাইরের সংস্কৃতিকে ভারতে প্রবাহিত করে স্থানীয় ঐতিহ্য বিকাশে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন৷ মুঘলদের দ্বারা ভারত অধিকৃত হওয়ার পর পারস্যের চিত্রশিল্পের ধারার কিছু পরিবর্তন করা হয়৷ যেমন পারস্যের চিত্রশিল্পগুলোতে প্রাণী এবং বৃক্ষের ছবিগুলো যেভাবে দূর অবস্থানে ফুটিয়ে তোলা হত, মুঘল চিত্রশিল্পে এক্ষেত্রে প্রাণী ও গাছপালার ছবিগুলো আরও স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে অতি ক্ষুদ্র ও সূক্ষ্ণ আঁচড়ে।  

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবরের সময়কার কোনও চিত্রকর্ম অবশ্য পরবর্তীতে পাওয়া সম্ভব হয়নি৷ তার লেখা বাবরনামা হতেও এ সম্পর্কে জানা যায় না৷ সম্রাট আকবরের সময়ে অবশ্য বেশ কিছু চিত্রকর্ম প্রস্তুত করা হয়৷ কিছু কিছু শিল্পকর্মের উপর তার সীলও পাওয়া যায়৷ মুঘলরা যেহেতু সুদূর তিমুর-ফারগানা হতে ভারতে এসেছিলো, তাই তাদের উপর স্পষ্টতই পারস্যের সংস্কৃতির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়৷ আর এ কারণেই এ সকল বিজেতারা পারসিক সাহিত্য এবং শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন৷

মুঘল শাসন আমলে রাজ্যে সমৃদ্ধ  শিল্পশালা ছিল, যাতে বিশিষ্ট শিল্পীদের দ্বারা চিত্রকর্মগিলো তৈরি করা হত। ভালো ভালো আর্টিস্ট বা চিত্রশিল্পীদের রাজ দরবারে সমাদর করা হত৷ অনেক সময় একটি চিত্রকর্মের জন্য অনেক শিল্পীরা সম্মিলিত হয়ে একত্রিতভাবে কাজ করতেন৷

মুঘল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় সম্রাট হুমায়ুন পারসিক শিল্পের অনুরাগী ছিলেন এবং তিনি ইরানের তাব্রিজ চহর থেকে  দুজন পারসিক আর্টিস্ট আবদ আল সামাদ এবং মীর সাঈদ আলীকে নিয়ে আসেন৷ হুমায়ুনের  ভাই কামরান মির্জা কাবুলে একটি শিল্প কর্মশালা পরিচালনা করছিলেন৷ ধারণা করা হয় যে সম্রাট হুমায়ুন কর্মশালাটিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন৷ এ সময়কার উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্ম হলো ‘খামসা অব নিজামি’ যে কাজটিতে বিভিন্ন চিত্রশিল্পীর চিত্রনৈপূন্যের অবদার স্পষ্ট প্রতীয়মান৷

মুঘল চিত্রশিল্পের চর্চা ও সর্বোচ্চ বিকাশ সম্ভবত সম্রাট হুমায়ূনের উত্তরাধিকারী সম্রাট আকবরের সময়কালে ঘটে৷ এ মহান সম্রাট শিল্প ও সংস্কৃতির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন৷ জানা যায় যে তরুণ বয়সে তিনি চিত্রশিল্পের উপর পড়াশোনাও করেন৷ এ সময়কার উল্লেখযোগ্য কাজগুলো হল, তোতানামা, হামজানামা, গুলিস্তান, দারাবনামা ইত্যাদি৷ ১৫৭০ সাল হতে ১৫৮৫ সাল অবধি সম্রাট আকবর একশরও অধিক চিত্রকরকে মুঘল চিত্রশিল্পের কাজে নিযুক্ত করেন৷

পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর শিল্প ও সংস্কৃতির অনুরাগী এবং পৃষ্টপোষক হিসাবে সমাদৃত ছিলেন এবং তার সময়ে মুঘল চিত্রশিল্পের উৎকর্ষ সাধিত হয়৷ তিনি ইউরোপীয় চিত্রকর্মের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন এবং তার শাসনামলে মুঘল চিত্রশিল্প একটি নতুন মাত্রা লাভ করে৷ তার সময়ে রচিত জাহাঙ্গীরনামায় অনেক চিত্রকর্ম পরিলক্ষিত হয়৷

মুঘল মিনিয়েচার পেইন্টিং শুধু শিল্প নৈপুণ্যেই উজ্জ্বল নয়, ঐতিহাসিক উপাদান হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ। মুঘল ভারতের শাসন, প্রশাসন, সমাজ, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক জীবনের ছাপ অতি নিপুণ ও স্পষ্ট  ভাবে প্রতিফলিত হয়েছে মিনিয়েচার চিত্রে। মুঘল মিনিয়েচার পেইন্টিং ভারতের শিল্প-গৌরব ও ঐতিহ্যের অম্লান অংশীদার হয়ে এখনও বিশ্বের বিভিন্ন মিউজিয়াম ও সংগ্রহশালায় দীপ্তি ছড়াচ্ছে।   

Source: বার্তা নিউজ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here